জীহাদী চেতনা নিয়ে সৈয়দ আহমাদ শহীদ বেরলভী রহমাুতল্লাহি আলাইহি বীর সংগঠকরূপে গমন করতে থাকেন ভারতের প্রত্যন্ত অঞ্চল । মুসলমানদের ইসলামী শরীয়াতের অলোকে চরিত্র গঠনের দাওয়াতী কাজে মনোনিবেশ করেন । ইসলামী শাসন ও বিশুদ্ধ আকিদাহ প্রতিষ্ঠাই ছিল তার লক্ষ । চরিত্র সংশোধন ও শরিয়াতের আনুগত্যের জীবন পরিচালনা করতে তার দরবারে হাজার হাজার মানুষের আগমন ঘটতো।
তারই ধারাবাহিকতায় গাইবান্ধা জেলায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, “নিশ্চিন্তিপুর মুহাম্মাদিয়া পাক দরবার শরীফ”। এই দরবারের মূল পরিচালক জুলফিকার রহমান বিপ্লব মুহাম্মাদী।
তরীকায়-এ-মুহাম্মাদী আত্মপ্রকাশ/সাইয়্যেদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (র.): প্রথমে সূফীবাদের চার তরিকায় অর্থাৎা তিনি, চিশ্তীয়া, কাদেরিয়া, নাকশবন্দিয়া ও মুজাদ্দেদিয়ায় তরীক্বায় দীক্ষা দিয়ে পরে তাঁর মুরিদদের মুহাম্মাদীয়া তরিকায় দীক্ষা দিয়ে থাকেন ।
সূফীবাদ বা আধ্যাত্মিক চিন্তা ধারায় এ তরিকার কেন্দ্রীয় বিষয়বস্তু ছিল সমাজ সংস্কার ও জিহাদ । এ মুহাম্মাদি তরিকায় আধ্যাত্মিক জীবন ও মারিফাতের সাথে শরিয়তের আইন – কানুন প্রবর্তনের প্রতি অধিক মনোযোগ দেয়া হয়।
ঐতিহাসিকদের মতে, তরিকায়ে মুহাম্মদিয়া ছিল সূফীবাদের উদাসীনতা ও ধর্মীয় আচার-আচরণের প্রতি অবজ্ঞার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ স্বরূপ। পীর পূঁজা, কবর পূঁজা, হজ্জ পালনে বাঁধাদান, বিধবা বিবাহে আপক্তি, শিয়াদের ভ্রান্ত মতবাদ ও অন্যান্য কুসংস্কারের বিরুদ্ধে ইমামুল হিন্দ শাহ্ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিছে দেহলভী (র.)-এর ক্ষোভ ও প্রতিবাদের বহিঃপ্রাকাশ ঘটেছে।
তাঁর পুত্র ও খলিফা সিরাজুল হিন্দ ইমাম শাহ আব্দুল আযীয দেহলভী (র.)-এর তারগীব-ই-মুহাম্মাদিয়া বা তরিকেয়ে মুহাম্মদিয়া। তাঁরই নির্দেশে সাইয়্যেদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (র.) সংস্কার ও জিহাদ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।
মুহাম্মাদি তরিকার সাথে অন্যান্য তরিকার কোন মৌলিক পার্থক্য নেই ।তবুও সশস্ত্র সংগ্রামের কর্মসূচী থাকায় এ তরিকায় আধ্যাত্মিক দর্শনের সাথে রাজনীতির প্রত্যক্ষ যোগাযোগ।
যামানার শ্রেষ্ঠতম আলিম ও ওলি-আল্লাহ মাওলানা কারামত আলী জৌনপুরী সাহেবের মতে, এ মুহাম্মাদি তরিকার দ্বারা অন্যন্য চার তরিকার বিরোধিতা করা হয়নি।পূর্বক্ত চার তরিকার সমন্বয়ে আধ্যাত্মিক ও পার্থিব উন্নতির পত প্রদর্শিত হয়েছে এ তরিকায়।
সাইয়্যেদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (র.) সাহেব এ তরিকাকে দুই ভাগে ভাগ করেন-রাহে বিলায়েত বা আধ্যাত্মিক পথ ও রাহে নবুয়ত বা নবী প্রদর্শিত পথ মিলেই তরিকায়ে মুহাম্মদিয়া।
বিভিন্ন অলি-আল্লাহর মতে তরিকায়ে মুহাম্মদিয়া বলতে ধর্মীয় সংস্কার, সমাজ সংস্কার ও সশস্ত্র সংগ্রাম বা জিহাদ আন্দোলন বুঝায়। এ আন্দোলনের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল মুসলমানদের জন্যে সে সব আচার ও নীতির প্রবর্তন করা, যা হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর সময় প্রচলিত ছিল।
সাইয়্যেদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (র.) বলেছেন. আমার তরিকা আমার পিতকুলের,নবীদের শ্রেষ্ঠ নবীর তরিকা।হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর তরিকা বা পথ ।
আমি একদিন পেট পুরে আহার করি ও আল্লাহর প্রশংসা করি এবং অন্যদিন উপবাসে থেকে ধৈর্য্য ধারণ করি।
উপমহাদেশের সমস্ত সিলসিলা বা দরবেশগন সাইয়্যেদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (র.)সাহেবকে নিজের উর্ধ্ব স্থান দিয়েছেন এবং তাঁর নিকট থেকে উপকৃত হন। তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ও সর্বজন মান্য হওয়া এবং তাঁর তরিকার মহত্ব ও ফজীলত, তাঁর প্রতি ভালবাসা ও আস্থা রাখা সম্পর্কে সে যামানার সকল আলিম ও শায়খ একবাক্যে ঐকমত্য পোষণ করেছেন।
সাইয়্যেদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (র.) সাহেবের হাতে বাইআত করার ভিতরে রাসূলুল্লাহ ( সাঃ) -এর সন্তুষ্টি নিহিত রয়েছে বলে যামানার সকল আলিম ও শায়েখগন বিশ্বাস করতেন। তাঁর প্রতি ভালবাসা রাখা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের বিশেষ আলামত বলে বিবেচিত হতো।
মাওলানা কারামত আলী জৌনপুরী সাহেব লিখেছেন- তাঁর (সাইয়্যিদ সাহেবের ) তরিকায় যে অগণিত বরকত ও আভান্তরীণ সৌন্দর্য রয়েছে তা’বলাই বাহুল্য ।বাহ্যিকভাবেও এতে একটি আশ্চর্যজনক বরকত পরিলক্ষিত হয় । তা’ হল, কোন লোক তাঁর তরিকায় বাইআত হওয়ার ইচ্ছা করলে পূর্বাহ্নেই প্রতিমা পূজা,শিরক, বিদআত, নাচ,-গান ও ঢোল-তামাশা পরিত্যাগ করার উপর দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়ে তবে বাইয়াত হয়। সুতরাং সাইয়্যিদ সাহেবের দীক্ষা গ্রহণ করা এদেশে সত্যিকার অর্থেই ইসলাম গ্রহণের পরিচয় বাহক।
এক সফরে রামপুর অবস্থানকালে তরিকায়ে মুহাম্মদিয়া সম্পর্কে সাইয়্যিদ আহমদ বেরেলভী সাহেবকে প্রশ্ন করা হয়। তিনি উত্তরে বলেন, তরিকায়ে মুহাম্মাদিয়ার তাৎপর্য এই-প্রত্যেক মানুষের প্রতিটি কাজ যেন একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য হয়।যেমন-পাপ হতে বিরত থাকার জন্যে বিয়ে করা, শরিয়ত সিদ্ধ নিয়মে অন্ন সংন্থানের জন্য বৈধ সম্পদ সংগ্রহ করে নিজেকে ও পরিবারবর্গকে পরমুখাপেক্ষি হতে না দেয়া, রাতের শেষে তাহাজ্জুদ নামাজ ও ইবাদত করার উদ্দাশ্যে প্রথম দিকে নিদ্রা যাওয়া, এভাবে জীবনের প্রতিটি কাজে একমাত্র খোদার সন্তুষ্টি লাভকেই মূল উদ্দেশ্য মনে করা তরিকায়ে মুহাম্মাদিয়ার সার।
মাওলানা কারামত আলী জৌনপূরী (র.) বলেন, হযরত পীর সাহেব তাঁর তরিকার নাম মুহাম্মাদিয়া এ কারণে রেখেছিলেন যে, কোন কোন ওলি-আল্লাহ কোন কোন নবীদের পদানুসরণ করে চলে থাকেন, যা নজর বরকদম স্বরূপ।মুর্শিদ বরহক্ব হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) -এর হুবহু পদানুসরণ করে চলতেন বলে তাঁর তরিকার নাম তরিকায়ে মুহাম্মাদিয়া রেখেছিলেন।
কলকাতায় মৌলভী গোলাম সোবহান মরহুম হযরত মুর্শিদে বরহককে প্রশ্ন করেছিলেন-আপনি আপনার তরিকার নাম মুহাম্মদিয়া কেন রেখেছেন? তিনি উত্তর দেন, উহা “নজর বরকদম” এর ব্যাখ্যা স্বরূপ। এ উত্তরের বর্ণনা সাইয়্যেদ মুহাম্মদ জাহের সাহেব লিখেছেন। তিনি মুর্শিদ বরহক এর নিকটতম আত্মীয় এবং খলীফাদের মধ্য ছিলে । ঐ সময় তিনি হযরত সাইয়্যেদ সাহেবের সঙ্গে ছিল। বর্ণনা নিম্নরূপ-তিনি বলেন, এরূপ বুঝে লও যে, কোন এক শহরের একজন বাদশাহ তার প্রত্যেক কর্ম ও ব্যবসায়ের আগ্রহ আছে। এজন্যে ঐ শহরের যত ব্যবসায়ী আছে প্রত্যেকে নিজ নিজ ব্যবসায় ও কারিগরীর দ্বারা বাদশাহকে সন্তুষ্ট করে এবং তার বাদশাহের নৈকট্যও লাভ করে। কারিগরদের মধ্যে কেউ কেউ এমন আছে যে, কেউ একটি কারিগরী জানে, কেউ দু,টি কারিগরী জানে, আবার কেউ হয়তো তিনটি কারিগরী জানে। এভাবে যতই উপরে যাক প্রত্যেকেই নিজ নিজ কারিগরীর তুলনা বাদশাহের আকর্ষণ লাভ করছে। আর যত কারিগরীই হোন না কোন প্রত্যেকটিই বাদশাহর নিকট গ্রহণীয়। মনেকরুন, ঐ সকল লোকদের মধ্যে এমন লোকও আছেন, যিনি সর্ব প্রকারের কাজ ও কারিগরীতে দক্ষ এবং তিনি বাদশাহর নিকটতম। আরো মনে করুন, তাদের মধ্যে এমন লোকও আছেন, যিনি মুন্শীগিরিতে অদ্বিতীয় এবং তীর ব্যবহারে খবই পটু, অশ্বারোহণে বেশ দক্ষ, এবং কুস্তিগীর পলওয়ান, এমন অদ্বিতীয় সৈনিক যেন তিনি ষুদ্ধের মাঠে শত্রুদের সম্মুখ হতে পলায়ন করার কথা জানেন না, মিস্ত্রি ও কামারের কাজও খুব উত্তম জানেন, এ ভবে যত কারিগরী আছে, প্রত্যেকটির মধ্যে তাঁর বিশেষ আগ্রহ এবং দক্ষতা আছে। ঐ ব্যক্তি সর্বক্ষণ বাদশাহর দরবারে উপস্তিত থাকে। কারণ বাদশাহর যখন যে কাজের দরকার, তার দ্বারা ঐ কাজ করিয়ে নেন। এখন একথা জানা দরকার যে, পূর্ববতর্ী যত বুজুর্গ লোক যারা তরিকার মালিক যেমন-হযরত খাজা মঈন উদ্দিন চিশতি (র.) হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দি (র.) প্রমুখ প্রত্যেকেই আমাদের পেশওয়া আগ্রগামী ছিলেন এবং ঐ সকল বুজুর্গদের তরিকার মধ্যে আমি বাইআত গ্রহণ করে থাকি।
আমি এ দাবী করি না যে, আমি তেঁদের চাইতে উত্তম।কিন্তু আল্লাহ তায়ালা আমাকে ঐ সকল বুজুর্গদের তরিকার মধ্যে ক্ষমতা দান করেছেন এবং আমি আল্লাহতায়ালার জিকির ও ইবাদাতে যেরূপ মগ্ন থাকি এবং আত্মশুদ্ধি ও চরিত্র শুদ্ধির প্রতি যতটুকু দৃষ্টি রেখে থাকি, সেরূপ শক্তি আল্লাহ তায়ালা হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) কে বিশেষভাবে দান করেছিলেন, তা হতে এ ফকিরকে সামান্য পরিমাণে কিছু দেয়া হয়েছে। আর সে শক্তিগুলো হল-জিহাদের কাজ, হুদুদ ও কিছাছের আদেশ জারি, শিরক ও বিদআতগুলোর ধ্বংস করা ইত্যাদি। আল্লাহর রহমতে আমি ঐ কাজগুলোর সমাধান করার ক্ষমতা আমার মধ্যে বিদ্যমান দেখতে পাই। আল্লাহতায়ালা আমাকে শক্তি দান করেছেন এর দ্বারা আমি বাসনা এবং সে বাসনা দ্বারা আশা করি যেন ঘোড়ায় আরোহণ করে কাফিরদের সাথে যুদ্ধ করি এবং যুদ্ধের অস্ত্র, তরবারি, নেজা, বশর্া, তীর, কামান বন্দুক ও পিস্তল বেঁধে এবং ঢাল নিজের শরীরে পরিধান করে আল্লাতায়ালার কলেমা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুল্লাল্লাহকে প্রচার করার জন্যে ঐ সকল কাফিরদের সাথে যুদ্ধ করি। ঐ প্রকার প্রদত্ত শক্তির দ্বারা পরিখা খনন নিজ হাতে করতে পারি, কুড়াল হাতে করে কাঠ চিড়তে পারি, হুদুদ ও কিছাছ (শরিয়ত অনুযায়ী শাস্তি) জারি করতে পারি। অতএব, এ খাছ নিয়ামতের আকাংখায় আমি আমার তরিকার নাম মুহাম্মাদিয়া রেখেছি। কারণ, হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) ঐ সকল কাজগুলো আপন পাক জাতের দ্বারা সম্পন্ন করেছেন।
জৌনপুরী সাহেব বলেছেন, যেহেতু তরিকায়ে মুহাম্মাদিয়া এক কথায় হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) -এর হুবহু অনুসরণকারী, কাজেই যাবতীয় তামালত এ তরিকার মধ্যে একত্রিত হয়ে রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে ধর্ম ও মাযহাবের উপর দৃঢ় থাকার কথা যা সুরায়ে হাশরের নিম্ন আয়াতের উপর আমল করলে হাছিল হয়, এর নামই তরিকায়ে মুহাম্মদিয়া।
রাসুল তোমাদের জন্যে যে সকল আদেশ আনয়ন করেছেন তা গ্রহণ কর আর যা নিষেধ করেছেন তা হতে বিরত থাক। (আল-কুরআন)।
তিনি বলেছেন, আসল কথা এই যে, তরিকায়ে মুহাম্মাদিয়া প্রবেশ করলে অন্বেষণকারী সরল তরিকাতেই প্রেবেশ করে। অপর দিকে তরিকায়ে মুহাম্মাদিয়াকে অস্বীকার করলে সমস্ত তরিকাই অস্কীকার করাহয়। কাননা তরিকায়ে মুহাম্মদিয়া সমস্ত তিকার সার।এ শরিয়ত অনুসরণ করার অর্থ সমস্ত শরিয়তের অনুসরণ করা।
তিনি আরোও বলেছেন,বলেছেন, তরিকায়ে মুহাম্মাদিয়া শেষ যামানার লোকদের জন্যে কিমিয়া স্বরূপ। এ তরিকার অসাধারণ শক্তি এই যে, পীর ভাইদের মধ্যে পরস্পর ভালবাসা জন্মিয়ে দেয়। এ তরিকায়ে মুহাম্মাদিয়ার প্রকৃত উদ্দেশ্য ও প্রধান স্তম্ভ হল মোকামে উবুদিয়াত অর্থাৎ প্রকৃত বান্দায় পরিণত হওয়া।
তিনি বলেছেন, পঞ্চম তরিকা-তরিকায়ে মুহাম্মাদিয়া কোথা হতে আসল, একথা বলা অজ্ঞতার পরিচায়ক। পূর্ব হতেই বহু তরিকা প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছে। এ চার করিকা ব্যতীত ,,চারি পীর চৌদ্দ খান্দান,, একথা যারা বলে তাদের একথা সম্পূর্ণ ভুল। প্রকৃত পক্ষে এসব কথা প্রত্যেকে নিজ নিজ জ্ঞানানুযায়ী বলেথাকে। পীরের খান্দান বহু আছেন এবং কি কিয়ামত পর্যন্ত হতে থাকবে।
তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের বিপরীত বিশ্বাস করবে, সে ব্যক্তিই তরিকায়ে মুহাম্মাদিয়ার বিরোধী। তাঁর বর্ণনামতে-তরিকায়ে মুহাম্মাদিয়ায় প্রবেশ করলে তার ফল এই হয় যে, সর্বসাধারণ স্ত্রী-পুরুষ কেবল তওবা করার জন্যে এ তরিকায় প্রবেশ করলে বাইআত করার সঙ্গে সঙ্গেই তারমধ্যে এক প্রকারের আন্তরিক পবিত্রতা তৎক্ষণাৎ লাভ হয়। যে ব্যক্তি ছুলুক ইল্লাল্লাহ (আল্লাহর নৈকট্য লাভ) এই নিয়তে এ তরিকায় প্রবেশ করে সে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার মেহেরবাণীতে ৮।১০ দিনের মধ্যেই নিজ উ!দ্দেশ্য অথবা উদ্দেশ্য লাভের কাছাকাছি উপস্তিত হতে পারবে,জিকির ও মোরাকাবার মিষ্টতা উত্তমরূপে বুঝতে পারবে।
হযরত মাওলানা শাহ্ মুহাম্মাদ আবদুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী (ছাহেব কিবলাহ ফুলতলী) বলেন, চার তরিকার প্রত্যেকটির নাম বিশেষ বিশেষ তরিকার বুজুর্গানদের নামকরণে হয়েছে। যেমন, হযরত বড় পীর সাহেব (র.) যে তরিকার তরবিয়ত দিতেন এর নাম কাদিরিয়া তরিকা। হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দি (র.) এর তরবিয়ত প্রদানকৃত তরিকার নাম নকশবন্দিয়া তরিকা। হযরত মুজাদ্দিদে আলফেসানী শায়খ আহমদ সিরহিন্দ (র.) যে তরিকার তালিম দিতেন এর নাম মুজাদ্দেদিয়া তরিকা। তেমনিভাবে আমিরুল মুমিনীন হযরত সাইয়্যিদ আহমদ বেরেলভী (র.) যে তরিকার তারবিয়ত দিতেন এর নাম তরিকায়ে মুহাম্মাদিয়া। তাঁর নিজের নামানুসারে তরিকায়ে আহমদিয়া না হয়ে তরিকায়ে মুহাম্মাদিয়া হওয়াই এ তরিকার বৈশিষ্ট্য। হযরত বেরেলবী (র.) -এর পূর্বেকার তরিকতের ইমামগণের সময়ে মানুষের জাহেরী আমল তুলনামূলক উত্তম ছিল। ইমামগণ শুধু মানুষকে বাতেনী ইলম ও আমলের তালিম দিতেন। হযরত বেরেলভী (র.) প্রত্যক্ষ করেন যে, তাঁর সময়ে মানুষের জেহেরী আমল আখলাক অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছে। শিরিক, বিদআত ও নানা ফেরকার জটিলতায় উপমহাদেশে এক অস্বস্তিকর পরিবেশ বিরাজিত ছিল। পার্শ্ববর্তি ধর্মীয়দের অনেক আচার-অনুষ্ঠানই মুসলমানগণ মেনে চলতেন। তিনি জাহেরী আমল তথা জীবনের সকল ক্ষেত্রে ইসলামী আদব আখলাক শিক্ষা দিতেন এবং সাথে সাথে ইলমে বাতিনেরও শিক্ষা দিতেন। যেমতু রাসুলুল্লাহ (সা:) এভাবে জাহেরী ও বাতেনী আমলের তারবিয়ত দিতেন, তাই হযরত বেরেলভী (র.) তাঁর তরিকার নাম রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর নামানুসারে তরিকায়ে মুহাম্মাদিয়া নামকরণ করেন।এক প্রশ্নের জবাবে হযরত ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ বলেন, তরিকায়ে মুহাম্মাদিয়া সম্পর্কে হযরত সাইয়্যেদ আহমদ (র.) কে প্রশ্ন করলে, তিনি যে উত্তর দেন সে উত্তর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, তাসাউফের প্রত্যেক তরিকতের উদ্দেশ্য ছিল জাহেরী শরিয়তের মাফিক নিজের অন্তরক রিয়াজত-মেহনত এবং ধ্যন দ্বারা সংশোধন করা। সাইয়্যেদ আহমদ (র.) যখন জিহাদের প্রস্তুতি নেন, তিনি প্রত্যক্ষ করেন রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর যুগে যেভাবে কুফরী স্থানের মধ্যে ইসলামকে বিস্তার করা দরকার ছিল সেভাবে ভারতের অদ্ধকার ভূমিতে ইসলামের পুণর্জাগরণের ব্যবস্থ জিহাদ দ্বারা করতে হবে।কাজেই তরিকায়ে মুহাম্মাদিয়া তাঁর তরিকার নাম রাখেন। তাঁর কাছে তরিকার শোগল সম্পর্কে জাজ্ঞাসা করলে তিনি উত্তর দেন, এ তরিকার শোগল হবে (আয়াত শরীফের অনুবাদ) -‘আপনি বলুন, আমার সালাত আমার কোরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের উদ্দেশ্যে।’ অর্থাৎ একজন মুসলমান তাঁর জীবনের প্রত্যেক মুহুর্তের কাজ আল্লাহর গোলামীর উদ্দেশ্যে করতে থাকবে এবং ‘আমরা শুধু তোমারই ইবাদত করি, শুধু তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করি (আল-কুরআন)-তা’ তার জীবনের সব কাজে বাস্তবায়িত করতে থাকবে। অর্থাৎ তরিকায়ে মুহাম্মাদিয়ার দ্বারা একজন লোক নিজকে নিজে খালিছভাবে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের মতের উপর বিলীন করে দিবে। এ উদ্দেশ্য জেনে ভারতের সত্য-খাঁটি উলামাগণ ও ধর্মপ্রিয় মুসলমানগণ এ তরিকাকে পছন্দ করেন এবং তরিকাভুক্ত হন, কেউ আপত্তি করতন না। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি প্রশ্ন করি যে, সাইয়ি্যদ আহমেদ সাহেবের সময়ের উলামা এবং মুসলমানগণ ও তাঁর পার্শবর্তী যুগের উলামা মুসলমানগণ সাইয়্যিদ আহমদ সাহেব সম্পর্কে ভাল জ্ঞাত ছিলেন, না দেড় দুশ বছর পরের লোক তাঁর সম্পর্কে ভাল জ্ঞাত হন
তরিকায়ে মুহাম্মাদীয়া সম্পর্কে সার কথা হল , হিন্দুস্তানে তখন তিনটি প্রসিদ্ধ তরিকা প্রচলিত ছিল। চিশতিয়া, কাদিরিয়া ও নকশবন্দিয়া। তাছাড়া নকশবন্দিয়া তরিকার একটি শাখাকে মুজদ্দিদে আলফে সানীর (রঃ) মাধ্যমে প্রাপ্ত বলে মুজাদ্দেদীয়া বলা হত। সৈয়দ আহমদ শহীদ ভেরেলভী (রঃ) উল্লিখিত তরিকাসমুহ ছাড়া মুহাম্মদি তরিকার ও বয়াত নিতেন এই সফরে রামপুরে অবস্তান কালে সৈয়দ আহমদ (র) কে তরিকায়ে মুহাম্মদিয়া সর্ম্পকে প্রশ্ন করা হয় । তিনি উত্তরে বলেন তরিকায়ে মুহাম্মদিয়া তাৎপর্য এইঃ প্রত্যেক মানুষের প্রতিটি কাজ যেন একমাত্র আল্লাহর সন্তূষ্টি লাভের জন্য হয় । যেমন পাপ থেকে বিরত থাকার জন্যবিবাহ করা শরীয়ত সিদ্ধ নিয়মে অন্ন সংস্তানের জন্য বৈধ সম্পদ সংগ্রহ করে। নিজকে ও পরিবার বর্গকে পরমুখাপেক্ষী হইতে না দেওয়া । রাতের শেষদিকে তাহাজ্জুদ নামায ও এবাদত করার উদ্দেশ্যে প্রথম দিকে নিদ্রা যাওয়া।
এভাবে জীবনের প্রতিটি কাজে একমাত্র খোদার সন্তূষ্টি লাভকেই মূল উদ্দেশ্য মনে করা কে তরিকায়ে মুহাম্মদিয়া সার। অথার্ৎ চার তরিকা মুতাবিক যিকর, ফীকর, মুরাকাবা করার সাথে সাথে জীবনের সকল কর্ম। হযরাত মুহাম্মাদ মুসতাফা সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের তরিকা মুতাবিক খালিছ আল্লাহ তালা’র সন্তূষ্টি লাভের উদ্দেশে্য সম্পন্ন করার উপর প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করাই তরিকায়ে মুহাম্মাদিয়ার মূল উদ্দেশ্য। সুতরাং বলা য্য় তরিকায়ে মুহাম্মাদিয়া’ শহীদে বালাকোট হযরত সায়্যেদ আহমাদ বেরেলভী রহঃ প্রতিষ্ঠিত এক আধ্যাত্মিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক আদর্শিক আন্দোলনের নাম। সেই সময়কার উপমহাদেশের ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে আওলাদে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওসাল্লাম ইমামুত্ তরিকত, আমীরুল মু’মিনীন হযরত সায়্যেদ আহমাদ শহীদ বেরেলভী (রহঃ) পরিচালিত সংস্কার ও আযাদী আন্দোলন তিনি ছিলেন যামানার মুজাদ্দিদ তথা যুগস্রষ্টা সংস্কারক। হানাফী মাযহাবলন্বী সুন্নী আক্বিদার এই শুদ্ধপন্থী বুজুর্গ ইমামুত তরিক্বত হিসাবে ”তরিকায়ে মুহাম্মাদিয়া” নামক যে মৌলিক তরিকার সূচনা করেছিলেন, তা ছিল ইমামুল হিন্দ হযরত শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দীসে দেহলভী রহঃ এর সংস্কারকর্মসূচীর বাস্তব প্রয়োগ। বিদেশী ও বিজাতীয় আধিপত্য, কুপ্রথা ও কুংস্কারের বিরুদ্ধে উপমহাদেশের মসলমানদের পুন;জাগরিত করে আজাদী আন্দোলনের পরিশীলিত গতিধারায় উদ্ধুদ্ধ করার মাধ্যমে তিনি আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম সিপাহসালারের ভুমিকা পালন করেছেন। আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক সুবিস্তৃত অধ্যায় জুড়ে আছে এই যুগস্রষ্টা চিন্তানায়কের নাম

