জরুরি তাগিদপত্র ও ঘোষণাপত্র ​তারিখ: ২৬শে আগস্ট, ২০২৬ (বুধবার) / ১২ই রবিউল আউয়াল বিষয়: আগামী ১২ই রবিউল আউয়াল (২৬শে আগস্ট, ২০২৬, বুধবার) উপলক্ষ্যে নিশ্চিন্তীপুর মোহাম্মদীয়া পাক দরবার শরীফ ও আওতাধীন সকল খানকায় পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা:) মহা সমারোহে উদযাপন সংক্রান্ত। ​অত্যন্ত আনন্দের সাথে জানানো যাচ্ছে যে, আগামী ১২ই রবিউল আউয়াল (ইংরেজি ২৬শে আগস্ট, ২০২৬, বুধবার) বিশ্বনবী, রাহমাতুল্লিল আলামীন হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর পবিত্র ধরায় আগমন অর্থাৎ পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সাঃ)। উক্ত দিনটি বিশ্ব মুসলিমের জন্য এক মহান আনন্দ ও আত্মিক নিয়ামতের দিন। ​এমতাবস্থায়, নিশ্চিন্তীপুর মোহাম্মদীয়া পাক দরবার শরীফ-এর মূল কেন্দ্রসহ আওতাধীন সকল শাখা খানকা শরীফ এবং রুহানি কেন্দ্রসমূহের সম্মানীত খলিফাবৃন্দ, দরবেশগণ ও দায়িত্বে নিয়োজিত খাদেমদের বিশেষভাবে নির্দেশনা প্রদান করা হচ্ছে যে— ​বিশেষ আয়োজন: প্রতিটি খানকায় ১২ই রবিউল আউয়াল (২৬শে আগস্ট, বুধবার) উপলক্ষ্যে খতমে কুরআন, জিকির-আজকার, দরূদ শরীফ পাঠ এবং প্রিয় নবী (সাঃ)-এর সিরাত ও তরিকায়ে মোহাম্মাদীয়ার আদর্শের ওপর গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা মাহফিলের আয়োজন করতে হবে। ​দোয়া ও মিলাদ মাহফিল: বিশ্ববাসীর হেদায়েত, মানবজাতির শান্তি এবং ভক্ত-আশেকানদের রুহানি উন্নতির উদ্দেশ্যে বিশেষ দোয়া ও মিলাদ মাহফিল পরিচালনা করতে হবে। ​তাবাররুক বিতরণ: সাধ্যমতো স্থানীয় ভক্ত, আশেকান ও সর্বস্তরের মানুষের মাঝে তাবাররুক বিতরণের সুব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ​পরিচ্ছন্নতা ও ভাবগাম্ভীর্য: দিবসটির পবিত্রতা রক্ষার্থে সকল খানকা প্রাঙ্গণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং পূর্ণ রূহানী ভাবগাম্ভীর্য বজায় রেখে কর্মসূচি বাস্তবায়ন করার তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। ​আশা করি, সকল খলিফা ও দরবেশবৃন্দ অত্যন্ত গুরুত্ব ও আন্তরিকতার সাথে নিজ নিজ দায়িত্বে এই কর্মসূচি সফল করবেন এবং সর্বস্তরের আশেকানদের এতে শামিল করবেন। ​আল্লাহ তাআলা আমাদের এই খেদমত কবুল করুন এবং প্রিয়নবীর শাফায়াত নসীব করুন। আমিন। ​আদেশক্রমে, শায়েখ জুলফিকার রহমান বিপ্লব মোহাম্মদী (ওস্তাদ মোহাম্মদী) নিশ্চিন্তীপুর মোহাম্মদীয়া পাক দরবার শরীফ

Menu

উস্তাদ মোহাম্মাদী

তরিকাতে একজন মুর্শিদ থাকেন যিনি আধ্যাত্মিক নেতার ভূমিকা পালন করেন। তরিকার অনুসারীদেরকে মুরিদ বলা হয়।

বেশ কিছু সুফি তরিকা প্রচলিত রয়েছে। যেমন চিশতি, নকশবন্দি, কাদেরিয়া, সোহরাওয়ার্দিয়া, মোহাম্মাদিয়া,মজাদ্দেদিয়া ইত্যাদি।

প্রধান সূফি তরিকাসমূহ
সম্পাদনা
তরিকা শব্দটি সুফিবাদের একটি গোষ্ঠী বা বর্গের জন্য, বিশেষ করে আধ্যাত্মিক শিক্ষা এবং হাকিকত (চূড়ান্ত সত্য) সন্ধানের লক্ষ্যে আধ্যাত্মিক অনুশীলনের জন্য ব্যবহৃত হয়। সাধারণত তরিকায় একজন মুর্শিদ (পীর বা পথ প্রদর্শক) রয়েছে যিনি নেতা বা আধ্যাত্মিক পরিচালকের ভূমিকা পালন করেন। তরিকার অনুসারীরা মুরিদীন (একবচন মুরিদ) নামে পরিচিত, যার অর্থ “অভিলাষী”, যেমন “ঈশ্বরকে জানার এবং ঈশ্বরকে ভালবাসার জ্ঞান কামনা”। সুফিবাদ উৎকর্ষ লাভ করে পারস্যে। সেখানকার প্রখ্যাত সুফি-দরবেশ, কবি-সাহিত্যিক এবং দার্শনিকগণ নানা শাস্ত্র, কাব্য ও ব্যাখ্যা-পুস্তক রচনা করে এই দর্শনকে সাধারণের নিকট জনপ্রিয় করে তোলেন। কালক্রমে বিখ্যাত ওলিদের অবলম্বন করে নানা তুরুক বা তরিকা গড়ে ওঠে। সেগুলির মধ্যে কয়েকটি প্রধান তরিকা সর্বাধিক প্রসিদ্ধি লাভ করে:

কাদেরিয়া তরিকা
সম্পাদনা
কাদেরিয়া তরিকা পৃথিবীর প্রাচীনতম সুফি তরিকাগুলোর মধ্যে অন্যতম। আবদুল কাদের জিলানির (১০৭৭-১১৬৬) নাম থেকে এই তরিকার নামকরণ করা হয়েছে। জিলান ইরানের একটি প্রদেশের নাম এবং এর অধিবাসীদের জিলানী বলা হয়ে থাকে। এই তরিকা ইসলামি বিশ্বে সর্বাধিক বিস্তৃততম সুফি তরিকাগুলো একটি এবং মধ্য এশিয়া, পাকিস্তান, তুরস্ক, বলকান এবং পূর্ব ও পশ্চিম আফ্রিকার বেশিরভাগ অঞ্চলে ব্যাপকভাবে এই তরিকার অনুসারী রয়েছে। ইসলামের মূলধারার বাইরে কাদেরিয়া তরিকা কোন বিশেষ মতবাদ বা শিক্ষা গড়ে তোলেনি। এই তরিকার অনুসারীরা ইসলামের মৌলিক নীতিগুলিতে বিশ্বাস করে, কিন্তু আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার মাধ্যমে সেই নীতিগুলোকে তারা ব্যাখ্যা করে।

চিশতিয়া তরিকা
সম্পাদনা
চিশতিয়া ত্বরিকা (ফার্সি: چشتیہ) বর্তমান আফগানিস্তানের হেরাতের উত্তর দিকে প্রায় ৯৫ মাইল দূরের ক্ষুদ্র শহর চিশতে ৯৩০ সালের দিকে এই তরিকার উদ্ভব হয়। তরিকাটি প্রতিষ্ঠাতা হলেন (খাজা) আবু ইশক শামি। লেভ্যান্টে ফিরে আসার পূর্বে, স্থানীয় আমীর (খাজা) আবু আহমাদ আবদালের (মৃত্যু ৯৬৬) পুত্রকে বায়াত করান, তাকে সুফিতত্ত্বের উপর প্রশিক্ষণ দেন এবং খেলাফত (আধ্যাত্মিক প্রতিনিধিত্ব) দান করেন। আবু আহমদের বংশধরদের, তারা চিশতিয়া নামেও পরিচিত, নেতৃত্বে চিশতিয়া তরিকা একটি অঞ্চলভিত্তিক তরিকা হিসেবে ছড়িয়ে পড়তে থাকে।এই তরিকায় ভালবাসা, সহিষ্ণুতা ও উদারতার উপর গুরুত্বারোপ করা হয়। ১২ শতকের মধ্যভাগে মইনুদ্দিন চিশতি লাহোর ও আজমিরে এই তরিকা আনয়ন করেন। চিশতি তরিকার প্রতিষ্ঠাতা আবু ইশক শামির পর তিনি এই ধারার অষ্টম ব্যক্তি। বর্তমানে এই তরিকার বেশ কিছু শাখা রয়েছে।

নকশবন্দি তরিকা
সম্পাদনা
নকশবন্দি তরিকা হল ইসলামের প্রধান সুফি তরিকাগুলোর একটি। পূর্বে এ তরিকা সিদ্দিকিয়া নামে পরিচিত ছিল, কারণ এই তরিকার ধারা পেছনের দিকে আবু বকর সিদ্দিকি (রাঃ) মাধ্যমে মুহাম্মাদ (সাঃ) এর সাথে সম্পর্কিত করে। অনেকেই এই তরিকাকে “শান্ত” তরিকা হিসেবে বিবেচনা করে থাকে, কারণ এই তরিকায় জিকির (স্রষ্ঠাকে স্মরণ করা) নীরবভাবে করা হয়ে থাকে যদিও অন্য তরিকাগুলোতে উচ্চস্বরে বা হালকা উচ্চস্বরে জিকির করা হয়ে থাকে। “নকশবন্দি” শব্দটি (نقشبندی) ফার্সি শব্দ, এই তরিকার প্রতিষ্ঠাতা বাহা-উদ-দিন নকশবন্দ বুখারীর নাম থেকে গৃহীত হয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন যে নকশবন্দ শব্দটির অর্থ “চিত্রকরের সাথে সম্পর্কিত”, আবার অনেকে মনে করেন এর অর্থ “চিত্রকর” এর পরিবর্তে “আদর্শ প্রণেতা” এবং “নকশবন্দ” শব্দটির অর্থ “আদর্শ সংস্কারক” হিসেবে ব্যাখ্যা করে।

মুজাদ্দিদিয়া তরিকা
সম্পাদনা
শায়খ আহমদ সিরহিন্দ মুজাদ্দিদে আলফে সানী রহ এর প্রতিষ্ঠিত তরিকাকে মুজাদ্দিদিয়া তরিকা বলা হয়। এটি মুলত বাহা-উদ-দিন নকশবন্দ বুখারী রহ. এর নকশবন্দিয়া তরিকার একটি গুরত্বপূর্ণ সংস্করণ। তাই একে নকশবন্দিয়া-মুজাদ্দিদিয়া তরিকাও বলা হয়ে থাকে। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, তুরস্ক ইত্যাদি দেশে নকশবন্দিয়া মুজাদ্দিয়া তরিকার প্রচলন বেশি। তবে সকল মুসলিম দেশেই এই তরিকার অনুসারি দেখা যায়।

মুহম্মদিয়া তরিকা
সম্পাদনা
সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরলভী (রহঃ) এই তরিকার ইমাম। এই তরিকা মুলত নকশবদ্দিয়া-মুজাদ্দিয়া তরিকা একটি শাখা। বাংলাদেশ ও ভারতের অনেক দরবার শরীফ এই ছিলছিলার অনুসারি। ফুরফুরা, ছরছিনা, রাজারবাগ, ফরায়েজিকান্দি, সোনাকান্দা ইত্যাদি দরবার শরীফ এই ছিলছিলার অন্তর্ভূক্ত।

উম্মিয়া তরিকা
সম্পাদনা
সমসাময়িক কালে প্রতিষ্ঠিত একটি তরিকা। এই মহাসন্মানিত মহাপবিত্র তরিকায়ে উম্মিয়াহ প্রতিষ্ঠা করেরাজারবাগ দরবার ঢাকা। এটি নকশবন্দিয়া-মুজাদ্দিয়া তরিকার একটি সংষ্করণ।

বেকতাশিয়া তরিকা
সম্পাদনা
তেরো শতকে ইসলামী সুফি সাধক বেকতাশ ভেলি বেকতাশি তরিকা প্রতিষ্ঠা করেন। পনের শতকে তরিকাটির প্রাথমিক পর্যায়ে হুরুফি আলী আল-আলা কর্তৃক ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছিল এবং ষোল শতকে বালিম সুলতান তরিকাটিকে পুর্নগঠন করেন।

মাদারিয়া তরিকা
সম্পাদনা
মাদারিয়া তরিকা উত্তর ভারত, বিশেষ করে উত্তরপ্রদেশ, মেওয়াত অঞ্চল, বিহার, গুজরাত ও বাংলায় জনপ্রিয় এবং একইসাথে নেপালে ও বাংলাদেশেও জনপ্রিয় সুফি তরিকা। প্রচলিত প্রথা ভাঙা, বাহ্যিক ধর্মীয় অনুশীলনের উপর শিথীলতা এবং আত্ম যিকিরের উপর জোর প্রয়োগের করনে সুপরিচিত, এটি প্রখ্যাত সুফি সাধক সৈয়দ বদিউদ্দীন জিন্দা শাহ মাদার (মৃত্যু ১৪৩৩খ্রি:) কর্তৃক প্রবর্তিত সূফি তরিকা এবং উত্তরপ্রদেশের কানপুর জেলার মকানপুরে তার দরবার ( দরগাহ ) কেন্দ্রিক তরিকা। তিনি তেরো শতকে আশরাফ জাহাঙ্গীর সেমনাণী সহ ভারতে আগমন করেন।

সুফিবাদের এই শাখা হজরত আলী (রাঃ) নিকট হইতে হজরত হাসান বসরী মারফত তাঁর শিষ্য খওয়াজা হাবিবে আজমী-এর সহিত সংযোগ সূত্র স্থাপন করে। খওয়াজা হাবিবে আজমীর নিকট হইতে তাঁর শিষ্য/মুরিদ বায়েজিদ বোস্তামী মারফত তৈয়ফুরিয়া প্রবর্তন হয়। তৈয়ফুরিয়া তরিকা থেকে শুরু করে, তাঁর পির বা আধ্যাত্মিক শিক্ষক বায়াজীদ তায়ফুর আল-বোস্তামি কর্তৃক প্রবর্তিত তৈয়ফুরিয়া তরিকা থেকে উৎপত্তি হয়ে মাদারীয়া তরিকা ১৫ থেকে ১৭ শতকের মাঝামাঝি মুগল আমলে বিশেষ গৌরব অর্জন করেছিল এবং শাহ মাদারের শিষ্যদের মাধ্যমে ভারতের উত্তরাঞ্চলীয় এলাকা, বাংলাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে এ নতুন তরিকা ছড়িয়ে পড়ে। বেশিরভাগ সুফি তরিকার মতই এটির প্রতিষ্ঠাতা মাদারের নামে একটি নিস্বাকে যুক্ত করে নির্মিত হয়েছে যা মাদারিয়া তরিকা নামে পরিচিত।

কুবরাইয়া তরিকা
সম্পাদনা
কুবরাইয়া তরিকা তেরো শতকে প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমান উজবেকিস্তানের বুখারায় তরিকাটি প্রতিষ্ঠা করেন নাজমুদ্দীন কুবরা নামে একজন ইসলামিক সুফি সাধক। ১২২১ সালে মঙ্গোলরা বুখারাকে দখল করে নিয়েছিল, তারা এলাকাটির প্রায় মানুষকেই গণহত্যার মাধ্যমে হত্যা করেছিল। মঙ্গলদের দ্বারা নিহতদের মধ্যে শেখ নাদজম ইদ-দিন কুবরাও ছিলেন।

মেভলেভি বা মৌলভি তরিকা
সম্পাদনা
মেভলেভি বা মৌলভি তরিকা (তুর্কি:Mevlevilik বা Mevleviyye; ফারসি:طریقت مولویه) কোনিয়ার (বর্তমানে তুরষ্কে) একটি সুফি তরিকা। ১৩শ শতাব্দীর কবি, আইনবিদ, ধর্মতাত্ত্বিক, অতীন্দ্রিবাদী ও সুফি জালালউদ্দিন রুমির অনুসারীরা তার মৃত্যুর পর এই তরিকা প্রতিষ্ঠা করেন। পশ্চিমা বিশ্বে এই তরিকার অনুসারীদেরকে ঘূর্ণায়মান দরবেশও বলা হয়।

মুরিদিয়া তরিকা
সম্পাদনা
মুরিদিয়া তরিকা সেনেগাল ও গাম্বিয়ার অত্যন্ত সুপ্রসিদ্ধ সুবৃহৎ ইসলামি সুফি তরিকা। এই তরিকার মূল কেন্দ্র সেনেগালের তওবাতে, শহরটি এই তরিকার একটি তীর্থস্থান। আরবি শব্দ মুরীদ, যার অর্থ ইচ্ছাপোষণকারী, থেকে এই তরিকার নামকরণ করা হয়েছে। ১৮৮৩ সালে আমাদু বাম্বা সেনেগালে মুরিদিয়া তরিকার প্রতিষ্ঠা করেন। সেনেগালের প্রায় ৪০% মানুষ মুরিদিয়া তরিকার অনুসারী।

রায্যাক্বীয়্যাহ্ তরিকা
সম্পাদনা
রায্যাক্বীয়্যাহ্ তরিকা পৃথিবীর প্রাচীনতম সুফি তরিকাগুলোর মধ্যে অন্যতম। রায্যাক্ব আলী গিলানীর (১০৯৩-১২০৮খৃঃ) নাম থেকে এই তরিকার নামকরণ করা হয়েছে। গিলান ইরানের একটি প্রদেশের নাম এবং এর অধিবাসীদের গিলানী বলা হয়ে থাকে। এই তরিকা ইসলামি বিশ্বে সর্বাধিক বিস্তৃততম সুফি তরিকাগুলো একটি এবং মধ্য এশিয়া, হিন্দুস্তান, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, নেপাল এবং পূর্ব ও পশ্চিম দেশের বেশিরভাগ অঞ্চলে ব্যাপকভাবে এই তরিকার অনুসারী রয়েছে। অনেকেই এই তরিকাকে “জালালী” তরিকা হিসেবে বিবেচনা করে থাকে, কারণ এই তরিকায় জিকির (স্রষ্ঠাকে স্মরণ করা) জালালতভাবে করা হয়ে থাকে যদিও অন্যান্য তরিকাগুলোতে উচ্চস্বরে বা হালকা উচ্চস্বরে জিকির করা হয়ে থাকে। ইসলামের মূলধারার বাইরে রায্যাক্বীয়্যাহ্ তরিকা কোন বিশেষ মতবাদ বা শিক্ষা গড়ে তোলেনি। এই তরিকার অনুসারীরা ইসলামের মৌলিক নীতিগুলিতে বিশ্বাস করে, কিন্তু আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার মাধ্যমে সেই নীতিগুলোকে তারা ব্যাখ্যা করে। এই তরিকার বর্তমান মূল কেন্দ্র চট্টগ্রাম জেলার পাহাড়তলী থানার অন্তর্গত দরবারে, শহরটি এই তরিকার একটি তীর্থস্থান।

নি’মাতুল্লাহি তরিকা
সম্পাদনা
নি’মাতুল্লাহি তরিকা পারস্যের সর্বাধিক বিস্তৃত সুফি তরিকার একটি। এটি শাহ নি’মাতুল্লাহ ওয়ালী (মৃত্য ১৩৬৭) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যা মা’রুফিয়াহ ধারার উত্তরাধিকার থেকে প্রতিষ্ঠিত এবং রূপান্তরিত হয়েছিল। বর্তমানে এই তরিকার অনেকগুলো উপশাখা রয়েছে, যেগুলোর মধ্যে পশ্চিমা বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত ও প্রভাবশালী ড. জাবেদ নূরবখশের বংশধর যিনি ইরানে ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর পশ্চিমা বিশ্বকে এই তরিকার সাথে পরিচয় করান।

সেনুসি তরিকা
সম্পাদনা
সেনুসি একটি ধর্মীয়-রাজনৈতিক সুফি তরিকা যা মুহাম্মদ ইবনে আলী-সেনুসসি কর্তৃক। মিশরীয় উলেমার সমালোচনার কারণে মুহাম্মদ ইবনে আলী-সেনুসি এই তরিকা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মূলত মক্কাতে এই আদর্শের সূচনা হয়, তবে ওহাবীদের অত্যধিক চাপের কারণে আস-সেনুসি মক্কা ছেড়ে চলে যান এবং সাইরেইনিকায় বসতি স্থাপন করেন যেখানে তাকে সাদরে গ্রহণ করা হয়। পরবর্তীতে ইদ্রিস বিন মুহম্মদ আল-মাহদী আস-সেনুসি সাইরেইনিকার আমির পদে অধিষ্ঠিত হন এবং লিবিয়ার রাজা পর্যন্ত হয়েছিলেন। মুয়াম্মার গাদ্দাফি তার এই রাজতন্ত্র বিলুপ করেন, কিন্তু লিবিয়ার এক তৃতীয়াংশ লোক এখনও নিজেকে সেনুসি বলে দাবি করেন।

শাযিলিয়া তরিকা
সম্পাদনা
Shadhili

শাযিলিয়া তরিকা হল আবুল-হাসান-আশ-শাযিলি কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত সুফি তরিকা। এই তরিকার মুরিদরা (অনুসারী) প্রায়শ শাযূলিয়া নামে পরিচিত। ফাসিয়া তরিকা, শাযিলিয়া তরিকার একটি শাখা, মক্কার ইমাম আল ফাসি কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এই তরিকার অসংখ্য অনুসারী সৌদি আরব, মিশর, ভারত, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, মরিশাস, ইন্দোনেশিয়া এবং অন্যান্য মধ্য প্রাচ্যের দেশগুলিতে রয়েছে।

সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকা
সম্পাদনা
মূ সোহরাওয়ার্দিয়া ত্বরিকা

সোহরাওয়ার্দিয়া হল সুফি আবুল নাজিব সোহরাওয়ার্দি কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত সুফি তরিকা। তার ভাতিজা শাহাব আল-দীন আবু হাফস উমর সোহরাওয়ার্দী দ্বারা বিধিবদ্ধ করা হয়েছিল।

তিজান্যিয়া তরিকা
সম্পাদনা
মূল নিবন্ধ: তিজান্যিয়া তরিকা

তিজান্যিয়া তরিকা শিক্ষা ও সংস্কৃতির উপর গুরুতারোপ করেছে এবং শিষ্যদের মধ্যে একে অপরের সাথে পারষ্পরিক সম্পর্কের উপরের জোর দিয়েছে।

মাইজভান্ডারী তরিকা
সম্পাদনা
মূল নিবন্ধ: মাইজভান্ডারী তরিকা

মাইজভান্ডারী তরিকা সুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত একটি সুফি তরিকা।এটি বাংলাদেশে সৃষ্ট একমাত্র তরিকা। এই তরিকা মূল নাম তরিকায়ে গাউছিয়া আহমদিয়া মাইজভান্ডারীয়া। এই তরিকা মূল বিষয় হচ্ছে প্রেমের মাধ্যমে স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভ। সৈয়দ আহমদ উল্লাহ হযরত বড়পীর সৈয়দ আব্দুল কাদের জিলানীর বংশধর ও উক্ত তরিকার খেলাফত প্রাপ্ত সৈয়দ আবু শাহামা মুহাম্মদ ছালেহ আল কাদেরী লাহোরী নিকট বায়েত গ্রহণের মাধ্যমে বেলায়ত অর্জন করেন এবং সৈয়দ দেলওয়ার আলী পাকবাজ এর নিকট হতে এত্তাহাদী কুতুবিয়তের ক্ষমতা অর্জন করেন। বিশ্বের অনেকগুলো দেশে এই তরিকার অনুসারী রয়েছে।

এছাড়া মাদারিয়া, আহমদীয়া, কলন্দরিয়া, রাহে ভান্ডার নামে আরও কয়েকটি তরিকার উদ্ভব ঘটে

পীরের কাছে বাইয়াতের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব

ইসলামী জীবন জিজ্ঞাসার পূর্ণতা ও স্থিতিশীলতার জন্য পীরের কাছে বাইয়াতের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব অপরীসিম। বাইয়াত শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে আনুগত্যের শপথ। নেতৃত্ব মেনে নেয়া, অঙ্গীকার লেনদেন, চুক্তি ও ক্রয় বিক্রয় ইত্যাদি। আর ইসলামী শরীয়াতের পরিভাষায় বাইয়াত হল আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি ও রেজামন্দি অর্জনের লক্ষ্যে নিজের জান ও মালকে ইসলামী জীবনযাত্রার দায়িত্বশীল ব্যক্তির বা হক্কানী পীরের আনুগত্যের শপথের মাধ্যমে আল্লাহর পথে উৎসর্গ করার ওয়াদা বা প্রতিশ্রুতির নাম। শরয়ী পদ্ধতি অনুযায়ী হক্কানী পীর বা শায়েখের নিকট বাইয়াত হওয়া শুধু জায়েজই নয় বরং উত্তমও বটে। যেমন- রাসূল (সঃ) এর হাতে বাইয়াত নেয়ার অর্থ হল আল্লাহ পাকের নিকট বাইয়াত গ্রহণ করা কেননা পবিত্র কোরআনের বহু আয়াতে বাইয়াত গ্রহণকারীর প্রশংসা করা হয়েছে। যেমন এক আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বাইয়াত গ্রহণকারীর প্রশংসা করে বলেন, হে নবী! নিশ্চয় যারা আপনার কাছে বাইয়াত গ্রহণ করে তারা মূলত আল্লাহর কাছে বাইয়াত গ্রহণ করে কেননা আপনার কাছে বাইয়াত গ্রহণকালে আল্লাহর কুদরতি হাত তাদের হাতের উপর ছিল।(সূরা ফাতহা-১০)। এমনিভাবে বাইয়াত গ্রহণকারীর উপর আল্লাহ তায়ালা সন্তুষ্টি প্রকাশ করে বলেন, নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের উপর সন্তুষ্টি হয়েছেন যখন তারা আপনার কাছে বাইয়াত গ্রহণ করছিল (সূরা ফাতহা-১৮)। অনুরূপভাবে সহীহ বুখারী ও মুসলিমদের বহু হাদিসে উল্লেখ আছে যে, রাসুল (স.) সুনির্দিষ্ট বিষয়ের উপর সাহাবাগণকে বাইয়াত করাতেন এবং রাসুল (স.) এর ইন্তেকালের পর খোলাফায়ে রাশেদীন সাহাবাগণকে এবং সাহাবাগণ পরবর্তী তাবেঈনদেরকে বাইয়াত করাতেন।

হযরত আববাদ ইবনে তামীম রহ. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, হাররার ঘটনার দিন যখন লোকজন আব্দুল্লাহ ইবনে হানজালা রা. এর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেছিলেন তখন ইবনে জায়েদ রা. জিজ্ঞাসা করলেন ইবনে হানজালা রা. লোকদের কিসের উপর বাইয়াত গ্রহণ করছেন তখন তাকে বলা হল দ্বীনের উপর অটল থেকে মৃত্যুবরণ করার উপর বাইয়াত গ্রহণ করছেন (বুখারী ৪১৬৭-১৯৫৯)। বাইয়াত গ্রহণকারীর সারা জীবন অঙ্গিকারের উপর অবিচল থাকা অপরিহার্য। এ ব্যাপারে আল কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা যখন অঙ্গীকার কর তখন আল্লাহর অঙ্গীকার পূর্ণ কর। তোমরা দৃঢ়তার সাথে অঙ্গীকার করার পর তা ভঙ্গ করোনা আর তোমরা নিজেদের জন্য আল্লাহকে জিম্মাদার স্থির করেছো তোমরা যা কর তা নিশ্চয়ই আল্লাহ পাক জানেন (সূরা নাহল- ৯১)।

এ প্রসঙ্গে হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেছেন, রাসুল স. শীতের এক সকাল বেলা বের হলেন। মুহাজির ও আনসারগণ তখন পরীখা খননের কাজে লিপ্ত ছিলেন তখন নবী সা. বললেন, হে আল্লাহ তুমি আনসার ও মুজাহিরদের ক্ষমা করে দাও। তখন তারা সাড়া দিয়ে জবাব দিলেন আমরাও সেই জামায়াত যারা আজীবন জিহাদ করার জন্য মুহাম্মদ স. এর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেছি (সহীহ বুখারী ৯/৭২০১)। ইমামুল মুসলিমিনের (আমীরের শায়েখ বা হক্কানী পীরের কাছে) বাইয়াত পূর্ণ করা অঙ্গীকারের অন্যতম অংশ এ জন্য বাইয়াত গ্রহণকারীর উচিত অঙ্গিকার পূর্ণ করার ওপর অবিচল ও সুদৃঢ় থাকা। এর থেকৈ বিচ্ছিন্ন থাকা কিংবা বিদ্রোহ করার সুযোগ কারো নেই। বহু সহিহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যে, ইমানের উপর মৃত্যু হওয়ার জন্য আমিরের বা হক্কানী পীরের হাতে আনুগত্যের (আল্লাহ পাকের হুকুম ও রাসুল স. এর সুন্নতের উপর অবিচল থাকার) বাইয়াত হওয়ার শর্ত অন্যথায় জাহিলিয়াতের উপর তার মৃত্যু হবে। হযরত ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসূল স. থেকে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি আমীরের হাতে আনুগত্যের বাইয়াত হওয়া ব্যতিত মৃত্যুবরণ করল সে জাহিলিয়াতের উপর মৃত্যুবরণ করল (মুসলিম তাবরানী ২২৫)।

অন্য এক হাদিসে হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল সা. এরশাদ করেন যে ব্যক্তি আমীরের ইতায়াত (আনুগত্য) থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বের হয়ে মৃত্যুবরণ করল সে অবশ্যই জাহিলিয়াতের উপর মৃত্যুবরণ করল (সহিহ মুসলিম ৪৮৯২)।

রাসুল (স.) এর জীবদ্দশায় তার দর্শন লাভেই মানুষ এহসানের স্তরে পৌছে যেত পূর্ববতী এবং পরবর্তী ওলি আউলিয়াদের গ্রন্থাবলীতে ব্যাপক হারে এ কথার উল্লেখ পাওয়া যায়। রাসূল (স.) এর জিয়ারত ও সাক্ষাত লাভই ইহসানের দরজা পর্যন্ত পৌছানোর জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু নবী স. এর ইন্তেকালের পরে যতই সময় অতিক্রান্ত হচ্ছে ততই নূরানী পরিবেশ থেকে দুরত্ব বেড়েই চলছে এবং মানুষের অন্তরের মাঝে ততই জুলমত ও আধার ঝেকে বসছে। হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী করীম স. যেদিন মদিনা মুনাওরায় তাশরীফ এনেছিলেন সেদিন মদিনার প্রতিটি বস্তু আলোচিত হয়ে গিয়েছিল এবং যেদিন রাসুল স. ইন্তেকাল করে দুনিয়া হতে বিদায় গ্রহণ করেন সেদিন প্রতিটা বস্তু আধারে ছেয়ে যায়। আমরা হুজুর স. এর ইন্তেকালের পর পবিত্র কবরে মাটি দেয়ার পর হাত ও ঝাড়িনী তখন আমরাই আমাদের অন্তরের নুরানীয়াতের মাঝে পরিবর্তন লক্ষ করি। অর্থাৎ আমাদের অন্তরে সেই পরিশুদ্ধতা ও নুরানীয়াত বিদ্যমান ছিল না। যা হুজুর স. এর সাক্ষাতে অনুভূত হতো- (মিশকাত শরীফ পৃষ্টা ৫৪৭)।

আল্লাহর পক্ষ থেকে নবী ও রাসূল সা. গণের দরজা বন্ধ হলেও কেয়ামত পর্যন্ত ওলি আওলিয়াদের দরজা খোলা থাকবে এবং ওলিদের কাছ থেকে মানুষ আল্লাহ পাকের সন্ধান লাভ করবে যার কারনে সাধারণ মানুষের জন্য ওলি আওলিয়াদের মহব্বত গ্রহণ করা জরুরী।

হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী করীম সা. এরশাদ করেছেন, বনী ইসরাইলের নবীগণ তাদের উম্মতগণকে শাসন করতেন এবং যখন কোন নবী ইন্তেকাল করতেন তখন আরেকজন তার স্থলাভিষিক্ত হতেন। আর আমার পরে কোন নবী আসবে না তবে অনেক খলিফা হবে সাহাবারা আরজ করলেন ইয়া রাসূল সা. আপনি আমাদের কি নির্দেশ করছেন। তিনি বললেন তোমরা ধারাবাহিকভাবে তাদের বাইয়াতের হক আদায় করবে তোমাদের উপর তাদের যে হক রয়েছে তা আদায় করবে, নিশ্চয় আল্লাহ তাদেরকে ওই সব বিষয়ে সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন যার দায়িত্ব তাদের উপর অর্পন করা হয়েছিল (সহীহ বুখারী ৩৪৫৫, মুসলিম ১৮৪২)।

হযরত বশীর ইবনে খাসাসীয়া রা. বলেন, আমি বাইয়াত হওয়ার জন্য রাসূল সা. এর খেদমতে হাজির হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, হুজুর আপনি আমার কাছ থেকে কি কি বিষয়ে বাইয়াত নিবেন। রাসূল সা. স্বীয় হস্তদ্বয় মোবারক বাড়িয়ে দিয়ে বললেন তুমি এ কথার স্বাক্ষ্য প্রদান কর যে, আল্লাহ তায়ালা ছাড়া কোন উপাস্য নেই এবং হযরত মুহাম্মদ সা. তার বান্দা ও রাসূল। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যথা সময় আদায় করবে, যাকাত প্রদান করবে, রমজানের রোজা রাখবে, হজ¦ করবে আর আল্লাহর পথে জিহাদ করবে। তিনি বললেন ইয়া রাসূল সা. সবগুলো বিষয় পালন করার সামর্থ্য আমার আছে তবে দুটি বিষয়ে পালন করার সামর্থ্য আমার কাছে নেই। একটি হলো যাকাত কারণ আমার নিকট মাত্র ১০টি উট আছে এগুলো দ্বারা আমার পরিবারের দুধ ও সোয়ারীর কাজ চলে। আর জিহাদ করার শক্তিও আমার নেই, কারন আমি দুর্বল সাহসের অধিকারী আমার আশংকা হয় যে, জিহাদে অংশগ্রহণ করার পর মৃত্যুর ভয়ে পলায়ন করে কিনা। এমন হলে তো আল্লাহর কোপানলে পতিত হবো। তার একথা শুনে রাসূল সা. স্বীয় হাত মোবারক গুটিয়ে নিয়ে বললেন ওহে বশির যাকাত ও জিহাদ ছাড়া তুমি কীভাবে জান্নাতে যাবে ! তখন আমি আরজ করলাম আচ্ছা আপনার হাত বাড়িয়ে দিন আমি বাইয়াত গ্রহণ করব তখন হুজুর সা. এর হাত বাড়িয়ে দিলেন। আমি উপরোক্ত সকল বিষয়ে উপর বাইয়ত গ্রহণ করি।

পবিত্র কোরআন এবং সহিহ হাদীস সমূহ অনুসন্ধান করলে দেখা যায় যে, রাসূল সা. খোলাফায়ে রাশেদীন এবং পরবর্তী অন্যান্য সাহাবা ও তাবেদীনগণ মোট তিন পদ্ধতিতে বাইয়াত করাতেন। ১। হাতের উপর হাত রেখে বাইয়াত করাতে, ২। কথার মাধ্যমে বাইয়াত গ্রহণ, ৩। চিঠি পত্রের মাধ্যমে বাইয়াত গ্রহণ।

১ম পদ্ধতি: হাতের উপর হাত রেখে বাইয়াত গ্রহণ: এ পদ্ধতির বাইয়াত হযরত সাহাবায়ে কেরাম হযরত মুহাম্মদ (স.) এর হাতের উপর হাত রেখে বাইয়াত হতেন। পবিত্র কোরআনে বাইয়াতের এ পদ্ধতি প্রশংসা করে বলা হয়েছে- আর যারা আপনার কাছে বাইয়াত গ্রহণ করে তারা মূলত আল্লাহর কাছে বাইয়াত গ্রহণ করে- সূরা ফাতাহ-১০। পাগড়ী বা রুমাল স্পর্শের মাধ্যমে বাইয়াত করা: বর্তমানে আমাদের দেশে হক্কানী পীর মাশায়েখগণ লম্বা পাগড়ি বা রুমাল ছেড়ে দিয়ে পরস্পরের শরীর স্পর্শের মাধ্যমে যে পদ্ধতিতে বাইয়াত করে থাকেন সেটা মুলত হাতের উপর হাত রেখে বাইয়াত হওয়ার অন্তর্ভুক্ত। কেননা যেসব মাহফিলে হাজার কিংবা লক্ষ লক্ষ লোক উপস্থিত হয় সেখানে এক সাথে সকলের হাতের উপর হাত রেখে বাইয়াত করা সম্ভব হয়না। অতএব, বর্তমানে হক্কানী পীর মাশায়েখগণ পাগড়ি বা রুমালের মাধ্যমে বাইয়াত করে থাকেন। এছাড়া এই সময় প্রথমে পীর বা শায়েখের নিকটবর্তী লোকেরা হাতের উপর হাত রাখেন তার পর পেছনের লোকের একজন আরেকজনের শরীর স্পর্শ করে বাইয়াত বা শপথ গ্রহণ করেন। অতএব এ পদ্ধতির বাইয়াত নিঃসন্দেহে হাতের উপর হাত রেখে বাইয়াত হওয়ার অন্তর্ভুক্ত হবে।

২য় পদ্ধতি : শুধুমাত্র কথার মাধ্যমে বাইয়াত করা। সাধারণ মহিলা বা অসুস্থ রোগীদেরকে রাসূল সা. পর্দার আড়ালে থেকে বাইয়াত করে নিতেন। তিনি কখনও মহিলাদের হাত কিংবা পর্দা লক্ষণ করে সরাসরি বাইয়াত করতেন না। অতএব বর্তমানে যদি তথাকথিত কোন পীর মহিলাদের হাত স্পর্শ করে কিংবা পর্দা লংঘন করে সরাসরি বাইয়াত গ্রহণ করে তাহলে বুঝতে হবে সে আসলে পীর বা আলেম নয় বরং পীররূপী শয়তান। এরূপ আলেম বা পীরের কাছে বাইয়াত হওয়া এং তার সাথে সম্পর্ক রাখা সম্পূর্ণ হারাম। রাসুল সা. শুধুমাত্র কথার মাধ্যমে মহিলাদের বাইয়াত করাতেন। হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, কোন মোমিন নারী রাসূল সা. এর কাছে হিজরত করে এলে (শর্ত সাপেক্ষে) নবী সা. তাকে বলতেন আমি কথার মাধ্যমে তোমাকে বাইয়াত করে নিলাম আল্লাহর কসম বাইয়াত গ্রহণকালে কোন নারীর হাত রাসূল সা. এর হাতকে স্পর্শ করেননি। নারীদের তিনি শুধু এ কথার দ্বারাই বাইয়াত করতেন যে, আমি তোমাকে এ কথার উপর বাইয়াত করলাম। বুখারী ৪৮৯১, ২৭১৩।

৩য় পদ্ধতি : চিঠিপত্রের মাধ্যমে বাইয়াত করা ছহিহ হাদিসে উল্লেখ আছে যে, নবী করীম সা. এবং হযরত সাহাবাগন কখনো কখনো দূরে অবস্থানরত লোকদেরকে চিঠি পত্রের মাধ্যমে বাইয়াত করে নিতেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে দীনার রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, লোকেরা যখন আব্দুল মালিকের নিকট বাইয়াত হলো তখন আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. তার কাছে পত্র লিখলেন যে, আমি মহান আল্লাহ ও তার রাসূলের আদর্শ অনুযায়ী আল্লাহর বান্দা আমিরুল মুমিনিন আব্দুল মালিকের কথা যথাসাধ্য শোনা ও তার আনুগত্য করার অঙ্গিকার করছি এবং আমার সন্তানরাও অনুরূপ অঙ্গিকার করছে (সহীহ বুখারী ৭২৩৫)।

নবী রাসূলগণ দুনিয়াতে আগমণ করার পর যেমনিভাবে তাদের আনুগত্য ও মহব্বত গ্রহণ করা উম্মতের জন্য জরুরী ছিল তেমনিভাবে নবী রাসুলগণের স্থলাভিষিক্ত খলিফাগণ, হক্কানী পীর মাশায়েখগণের মহব্বত গ্রহণ করাও সাধারণ মানুষের জন্য জরুরী। কেননা দুনিয়াতে একমাত্র হক্কানী আলেম ও পীর মাশায়েখগনই হলেন নবী রাসূলগণের ওয়ারীশ রুহানী সন্তান।

পীরের কাছে বাইয়াত হওয়ার আগে কামেল এবং খাটি পীর চিনে নিতে হবে এবং তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ যে সকল গুণাবলী থাকা আবশ্যক তার মধ্যে অন্যতম হলো: কুরআন হাদীসের ইলম থাকা, মুত্তাকী ও নেককার হওয়া, সুন্নতের অধিকারী হওয়া, কোন কামেল পীরের সংস্পর্শে থেকে বাতেনী ইলম হাসিল করা, আলেমগণের সমর্থন ও আস্থা থাকা, ছোহবত প্রতিক্রিয়াশীল হওয়া, উত্তরোত্তর তার পীরের মুরিদের অবস্থার উন্নতি ও সংশোধন হওয়া।
পীর একটি ফার্সি শব্দ। পীরের আরবী শব্দ হল মুর্শিদ (পথ প্রদর্শক শায়েখ) যেমন নামাজের আরবী শব্দ সালাত। মানুষ সালাতকেই নামাজ হিসেবে চিনে জানে ও আদায় করে। রোজা এর আরবী শব্দ হল সাওম। মানুষ সওমকেই রোজা হিসেবে চিনে জানে ও আদায় করে। বেহেশত, দোযখ এর আরবী শব্দ হল জান্নাত, জাহান্নাম।
নামাজ রোজা ও বেহেশত দোযখ এসকল শব্দগুলো কোরআন হাদীসে উল্লেখ নেই। নবী সা. সালাত, সাওম, জান্নাত, জাহান্নাম সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। কিন্তু কখনও নামাজ রোজা বেহেস্ত দোযখ উচ্চারণও করেননি। পীর শব্দটিও তেমনি নামাজ রোজার মত কোরআন হাদীসে না থাকলেও এর আরবী শব্দটি কোরআন হাদীসে উল্লেখ রয়েছে।

যেমন- কোরআনে এরশাদ রয়েছে- হে ঈমানদারগণ তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সাথী হও (সূরা তওবাহ- ১১৯)। আল্লাহ পাক এখানে সাদেকীন অর্থাৎ সত্যবাদী আল্লাহ ওয়ালাদের সাথে থাকতে বলেছেন। অন্য এরশাদ রয়েছে আল্লাহ যাকে হেদায়াত দিবেন তাকে মুর্শিদের ব্যবস্থা করে দিবেন। যেমন আল্লাহ পাক যাকে সৎ পথ দেখান সে সৎপথ প্রাপ্ত হন এবং তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন আপনি কখনই তার কোন পথ-প্রদর্শনকারী অভিভাবক পাবেন না (সূরা কাহাফ-১৭)। এখানে সাদেকীন, সত্যবাদী ও মুর্শিদ পথ প্রদর্শনের কথা বলা হয়েছে এই সাদেকীন সত্যবাদী, মুর্শিদ ও পথ প্রদর্শকগণ হলেন পীর মাশায়েখগণ।

এ জন্যই পীর ওলিদের সাথে শত্রুতা রাখা আল্লাহর সাথে যুদ্ধের শামিল বলা হয়েছে। যেমন- আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুল সা. এরশাদ করেন, আল্লাহ তায়ালা বলেন, যে ব্যক্তি আমার কোন ওলির সাথে শত্রুতা রাখবে আমি তার সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করি (সহিহ বুখারী ৬৫০২)। অনেকে পীর বা ওলীদের সম্পর্কে না জেনে শুনে খারাপ মন্তব্য করে এমনকি শত্রুতাও করে থাকে অথচ আলোচ্য হাদিসে (এটি হাদিসে কুদসী) স্বয়ং আল্লাহ পাক ওলিদের বিরুদ্ধে শত্রুতা পোষন করতে নিষেধ করেছেন। যেমন পীরের (পরহেজগার), মুত্তাকিন, ওলিদের পরিচয় দিতে গিয়ে মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেন, যেনে রেখ আল্লাহর বন্ধুদের (আওলিয়া) কোন ভয় নেই এবং তারা চিন্তাম্বিতও হবে না। তারা এমন লোক যারা ইমান এনেছে এবং পরহেজগারী অবলম্বন করেছে। তাদের জন্য সুসংবাদ রয়েছে পার্থীব জীবনে এবং আখিরাতের আল্লাহর বানী সমূহের কোন পরিবর্তন নেই এটাই বিরাট সফলতা (সূরা ইউনুস ৬২, ৫৩৬৪)

মোর্শেদের দরবারে মুরিদের আদব

মোর্শেদের দরবারে মুরিদের অন্যতম করণীয় কার্য হলো-আদব রক্ষা করে চলা। আদব মুরিদের ইমানকে মজবুত করে এবং মোর্শেদের প্রতি মুরিদের এশ্ক ও মহব্বত সৃষ্টি করে। আদব মুরিদকে সাধনার উচ্চ শিখরে পৌঁছতে সহায়তা করে। মূলত মুরিদকে মোর্শেদের দরবারে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে হলে আদাবুল মুরিদের কোনো বিকল্প নেই। মুরিদ যদি কোনো পাপ কাজ করে আর এজন্য সে যদি অনুতপ্ত হয়ে আপন মোর্শেদের অসিলা ধরে মহান আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করে, তাহলে আল্লাহ্ তাঁর অলী বন্ধুর অসিলায় তাকে ক্ষমা করেন। কিন্তু কোনো মুরিদ যদি সেই আপন মোর্শেদ বা তাঁর আওলাদ ও আহালদের সাথে বেয়াদবি করে, তাহলে মোর্শেদ অসন্তুষ্ট হন। ফলে মুরিদের আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাওয়ার আর কোনো উপায় থাকে না। অসিলা বিহনে যেমন আল্লাহ্কে পাওয়া যায় না। ঠিক তেমনি অসিলা বিহনে হযরত আদম (আ.) গন্ধম খাওয়ার অপরাধে আল্লাহ্ অসন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে বেহেশত থেকে বিতাড়িত করেন। অতঃপর হযরত আদম (আ.) বছরের পর বছর কেঁদে কেঁদে আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। এভাবে ৩৯০ বছর কান্নাকাটি করার পরও তিনি ক্ষমা পাননি অথচ হযরত আদম (আ.) যখন মহান রাব্বুল আলামিনের সর্বশ্রেষ্ঠ বন্ধু দোজাহানের বাদশাহ্ রাহমাতুল্লিল আলামিন হযরত রাসুল (সা.)-কে মোর্শেদরূপে গ্রহণ করে তাঁর অসিলা ধরে আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করেন। মহান প্রভু তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ বন্ধুর বরকতে হযরত আদম (আ.)-কে সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমা করে দিলেন এবং সেই সাথে তাঁকে তিনটি পুরস্কার দিলেন। যথা-

১. তাঁকে ক্ষমা করে দিলেন।

২. প্রথম নবি হিসেবে মনোনীত করলেন ও

৩. সকল নবি-রাসুল ও মানুষের আদি পিতা হিসেবে নির্বাচিত করলেন।

এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, অসিলা ছাড়া আল্লাহ্কে পাওয়া যায় না এবং প্রার্থনাও কবুল হয় না। মোর্শেদই মুরিদের অসিলা। কিন্তু মুরিদ যদি আপন মোর্শেদের সাথে বেয়াদবি করে তাহলে অসিলা ধরার তার কোনো পথ থাকে না এবং সেই মুরিদ ক্ষমাও পায় না। ফলে তার সমস্ত সাধনাই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। আল্লাহ্্র সন্তুষ্টি অর্জন করতে হলে মোর্শেদের দরবারে মুরিদকে আদব রক্ষা করে চলতে হয়। আদব হলো মুরিদের অলঙ্কার, যা মুরিদকে সু-সজ্জিত করে আল্লাহর পথে পরিচালিত করে। আল্লাহ্ বেয়াদবকে পছন্দ করেন না। বেয়াদবের কোনো ধর্ম নেই। বেয়াদবি মানুষকে আল্লাহ্ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে।

আদাবুল মুরিদ বা মুরিদের আচরণ কিরূপ হওয়া উচিত, নিম্নে তা উপস্থাপন করা হলো-

১. নিজের মোর্শেদ হতে অন্য মোর্শেদকে ভালো মনে করলে নিজ মোর্শেদের ফায়েজ লাভ হবে না।

২. মুরিদ সকল দিক হতে মনকে মোর্শেদের দিকে একনিষ্ঠ চিত্তে নিয়োজিত করবেন এবং যথা শক্তি জান-মাল দিয়ে মোর্শেদের গোলামি করবেন।

৩. মোর্শেদের সান্নিধ্যে যতক্ষণ থাকবেন, ততক্ষণ অন্যদিকে তাকবেন না বা মনোযোগ দিবেন না, বরং মোর্শেদের দিকে আদবের সঙ্গে একনিষ্ঠ থাকবেন। তাঁর হুকুম ছাড়া তাঁর সম্মুখে ফরজ ও সুন্নত ব্যতীত অন্য কোনো নফল ইবাদতও করবেন না।

৪. মোর্শেদের জায়নামাযের উপর পা রাখবেন না। তাঁর বাথরুম ব্যবহার করবেন না।

৫. মোর্শেদের ব্যবহৃত কোনো জিনিস ব্যবহার করবেন না।

৬. মোর্শেদের হুকুম ব্যতীত তাঁর সম্মুখে পানাহার করবেন না এবং কারো সঙ্গে গল্প-গুজব করবেন না।

৭. মোর্শেদের দিকে অথবা তাঁর দরবার শরীফের দিকে পা বিস্তার করবেন না এবং থু থু ফেলবেন না।

৮. মোর্শেদের কোনো কাজে সন্দেহ পোষণ করবেন না, যদিও জাহেরাতে তা সঠিক মনে না হয়। কেননা, কামেল মোর্শেদ অধিকাংশ সময়ই আল্লাহ্ তায়ালার পক্ষ হতে এলহাম পেয়ে কাজ করে থাকেন। সুতরাং মোর্শেদের কাজের তাৎপর্য বুঝতে না পারলে এতে নিজের ধারণা খারাপ করে নিজের ক্ষতি করবেন না।

৯. সকল কাজে মোর্শেদের আদর্শ অনুসরণ করবেন।

১০. মোর্শেদের নিকট কারামত দেখতে চাবেন না। কেননা, কাফের ও নাফরমান ব্যতীত হযরত রাসুল (সা.)-এর নিকট কেউ মোজেযা দেখতে চায়নি।

১১. মুরিদের মনে কোনো প্রকার সন্দেহ সৃষ্টি হলে যত দ্রুত সম্ভব মোর্শেদের নিকট বলবেন। মোর্শেদ বিষয়টি বুঝিয়ে দিলে তা বুঝতে হবে, বুঝা না গেলে নিজের ত্রুটি মনে করতে হবে। মোর্শেদের প্রতি কোনো প্রকার সন্দেহ বা দ্বিধাভাব পোষণ করবেন না।

১২. মুরিদের নিকট কাশ্ফ বা এলহামের মাধ্যমে সংবাদ এলে মোর্শেদের নিকট বলতে হবে।

১৩. যে প্রকারের ফায়েজ ও বরকত যা কিছু হাসিল হোক না কেন, তা আপন মোর্শেদের অসিলায় হয়েছে বলে মনে করতে হবে।

১৪. মুরিদ যদি মোর্শেদের প্রতি আদব রক্ষা না করে, মোর্শেদের নিকট নিজের ত্রুটি ও অক্ষমতা প্রকাশ না করে, তবে সে মোর্শেদের নেয়ামত হতে বঞ্চিত হবে।

এছাড়া আদাবুল মুরিদ সম্পর্কে ‘নূরুল আলা নূর’ কিতাবের ৭ম হেদায়েতে ও ‘জামেউল অছুল’ কিতাবে বর্ণিত রয়েছে। নিম্নে এর আলোকে আদাবুল মুরিদ আলোচনা করা হলো-

১। মোর্শেদের সান্নিধ্যে এসে মুরিদ তাঁর নিকট এ আর্জি পেশ করবেন- আমি আপনার খেদমতে আল্লাহর মারেফত শিক্ষা করতে এসেছি। মোর্শেদ যদি কবুল করেন, তবে আর কিছু বলবেন না। অর্থাৎ-সবকাদি চাবেন না। বরং খুব আদবের সাথে মোর্শেদের খেদমত করবেন। অতঃপর মোর্শেদের দিকে সর্বদা মন নিবিষ্ট রাখবেন।

২। মোর্শেদের নিকট অপরের সালাম নিয়ে আসা আদবের খেলাফ।

৩। মোর্শেদ যা নির্দেশ করেন, বিলম্ব না করে তখনি তা পালন করবেন।

৪। মোর্শেদের সঙ্গে কোনো প্রকার বাদানুবাদ ও তর্কের কারণে মুরিদের অন্তরে যে পর্দা পড়ে, তার কোনো চিকিৎসা নেই। এতে মুরিদের ফায়েজ বন্ধ হয়ে যায়।

৫। মুরিদ নিজের বাতেনি অবস্থায় ভালো-মন্দ যা হোক না কেন মোর্শেদকে জানাবেন। মোর্শেদ অবস্থা বুঝে প্রতিকার করবেন। কারণ তিনি আত্মার চিকিৎসক। মুরিদের আত্মার অবস্থা বুঝে তিনি চিকিৎসা করে থাকেন।

৬। মোর্শেদ কাশফের মাধ্যমে মুরিদের অবস্থা জানেন, এ ভরসায় মুরিদ বসে না থেকে নিজের অবস্থা জানাবেন।

৭। মারেফত লাভ করতে হলে শক্ত করে মোর্শেদের দামান ধরবেন। কোনো কষ্ট মছিবত গ্রাহ্য করবেন না, জান-মাল সবই মোর্শেদের কদমে কোরবান করে দিবেন। উদ্দেশ্য এই যে, কামেল মোর্শেদের অসিলা ব্যতীত আল্লাহর মহব্বত লাভ হবে না।

৮। মোর্শেদের বিনা অনুমতিতে তাঁর সকল আদত ও অভ্যাস অনুসরণ করবেন না। কেননা, মোর্শেদ স্থান, কাল ও পাত্র ভেদে বিবেচনা মতো কাজ করে থাকেন। মুরিদ এর তাৎপর্য না বুঝে অনুসরণ করতে থাকলে কোনো সময় তা বিষ তুল্য হতে পারে। তবে মোর্শেদ যা করার জন্য আদেশ করেন, তা বিনা দ্বিধায় পালন করবেন।

৯। মুরিদ নিজেকে সকলের চেয়ে নিকৃষ্ট ও হীন মনে করবেন। মোর্শেদের দরবারে নিজের মকসুদ ব্যতীত সকল বিষয় হতে যথাসম্ভব দূরে থাকবেন। শুধুমাত্র জাত-পাক আল্লাহ্ তায়ালার মহব্বত ব্যতীত মোর্শেদের নিকট অন্য কিছু প্রত্যাশা করবেন না। মোর্শেদের হাতে মুরিদ এরূপে থাকবেন, যেরূপ গোসলকারীর হাতে মুর্দা থাকে।

১০। মোর্শেদ কোনো আদেশ না দিলে তাঁকে কোনো দিকে ইঙ্গিত করবেন না।

১১। মুরিদ নিজ ত্রেুাধ সংবরণ করবেন। অন্যথায় এতে জিকিরের নুর হ্রাস পায়। কোনো তর্ক-আলোচনায় নিজ মত বজায় রাখার জন্য ঝগড়া করবেন না। কারণ ঝগড়া ও তর্কে ভুল পয়দা হয় এবং অন্তর মলিন হয়। হঠাৎ যদি কারো সাথে ঝগড়া-কলহ হয়ে পড়ে, তাহলে তখনই তওবা করবেন। যদি নিজের দাবী হক ও সত্য হলেও প্রতিপক্ষের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবেন।

১২। কারো প্রতি ঘৃণার নজরে তাকাবেন না।

উক্ত ‘জামেউল ওছুল’ কিতাবে ‘আদাবুল মুরীদের’ বয়ানে বিশেষ জরুরী ও সর্ববাদী সম্মত মতে কয়েকটি নীতি লিখেছেন। এর আলোকে নিম্নে আদাবুল মুরিদের আরো কিছু বিষয় উপস্থাপন করা হলো-

১। মুরিদ নিজ মোর্শেদের প্রতি এরূপ প্রগাঢ় বিশ্বাস রাখবেন যে, নিজ মোর্শেদের অসিলায় যাবতীয় মকসুদ হাসিল হবে। নিজ মোর্শেদ ব্যতীত মুরিদ যদি অন্যের প্রতি কিছুমাত্র আশা-ভরসা করে তবে তার ফায়েজ বন্ধ হয়ে যাবে।

২। ছোটো-বড়ো সকল কাজে, ইবাদতে ও আদব-আখলাকে মুরিদ নিজ ইচ্ছাকে মোর্শেদের ইচ্ছার উপর ছেড়ে দিবেন।

৩। মোর্শেদ যা মাকরূহ মনে করেন বা পছন্দ না করেন, তা হতে সর্বদা দূরে থাকবেন।

৪। মোরাকাবা, মোশাহেদা বা খাবে (স্বপ্নে) কোনো হালাত মালুম হলে নিজে তার তাবির করবেন না। যদিও তাবির নিজের মালুম হয়, তার উপর নির্ভর না করে মোর্শেদের নিকট অবস্থা প্রকাশ করত জবাবের জন্য প্রতীক্ষা করবেন। তাঁর নিকট জবাব তলব করবেন না অর্থাৎ জবাবের জন্য বিরক্ত করবেন না।

৫। মোর্শেদ কোনো কথা জিজ্ঞাসা করা মাত্রই তার জবাব দিবেন।

৬। মুরিদ মোর্শেদের নিকট ক্ষীণ স্বরে কথা বলবেন। কেননা, মোর্শেদের সম্মুখে উচ্চ স্বরে কথা বলা বেয়াদবি। মোর্শেদের দরবারে কথাবার্তা ও ছওয়াল জবাব বাড়াবেন না। কারণ এতে মুরিদের দিল হতে মোর্শেদের প্রেম-হ্রাস পায় ও মুরিদের অন্তরে পর্দা পড়ে যায়।

৭। মোর্শেদের সাথে সময় বুঝে কথা বলবেন। অর্থাৎ-একান্ত সুযোগ উপস্থিত হলে আদব ও বিনয়ের সাথে শ্রবণ করবেন। এর ব্যতিক্রম হলে ফায়েজ বন্ধ হয়ে যাবে। এটি একবার বন্ধ হলে পুনরায় চালু করা কঠিন হয়ে যাবে।

৮। মুরিদের হাল, এলহাম ও কাশফ ইত্যাদি যা আল্লাহ্ এনায়েত (দান) করেন, তা মোর্শেদের নিকট প্রকাশ করবেন।

৯। মোটকথা, আদব ও চরিত্রই হচ্ছে মোর্শেদের নেক নজর লাভের উপায়।

পীর ও মুর্শিদের প্রতি মুরীদের আদবসমূহ: একজন মুরীদ কিভাবে পীর ও মুর্শিদের প্রতি মুহাব্বত সহকারে আদব বজায় রেখে ইসলামী জীবন পরিচালনা করবে তা নিন্মে প্রদত্ত করা হলো:
(১) আল্লামা মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমী (রা:) বলেন, যার আদবের অভাব এবং আনানিয়াতের স্বভাব রয়েছে সে কখনো মূল উদ্দেশ্যে পৌছতে পারবে না। তরিকতে আদবের ভূমিকা অপরিসীম। আদবেই আউলিয়া হওয়া যায়। আল্লামা জালাল উদ্দিন রুমী (রা:) আরো বলেন, বে-আদব মাহরুম গাশত আজ ফজলে রব অর্থাৎ যার আদব নেই সে আল্লাহর সকল প্রকার অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত। (মসনবী শরীফ)
তাহলে যে যত বড় ইবাদতকারী হোক না কেন যদি আদব বিদ্যমান না থাকে তবে সে আল্লাহর সকল প্রকার দয়া, অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত থাকবে। সুতরাং বুঝা গেল ইবাদতের চেয়ে আদবের ক্ষমতা অনেকগুণ বেশি।

(২) মুজাদ্দিদ-ই আলফে সানী (রা:) স্বীয় মাকতুবাত শরীফে আদবের ব্যাপারে বলেন, মুরিদ সমস্ত দিক হতে তার মন ফিরিয়ে স্বীয় মুর্শিদের প্রতি মনস্থাপনা করা আবশ্যক।
(৩) এরূপ স্থানে দাঁড়াবে যেন স্বীয় শরীরের ছায়া পীরের ছায়ার উপর না পরে।
(৪) কখনো পীরের নামাজের মসলা (বিছানার) উপর পা রাখবে না।
(৫) তার পাত্রে কোন সময় অজু করবে না।
(৬) তার ব্যবহৃত পাত্র ব্যবহার করবে না।
(৭) তার সামনে অন্য কারো সাথে কথা বার্তায় লিপ্ত হবে না।
(৮) অন্য কারো প্রতি লক্ষ্য করবে না।
(৯) পীরের অসাক্ষাতে তিনি যেখানেই আছেন ঐ দিকে পা লম্বা করে বসবে না। সে দিকে থুথু ফেলবে না।
(১০) পীর হতে যা প্রকাশ হয় তা প্রকাশ্যভাবে তা খারাপ বিবেচনা হলেও ভালো মনে করতে হবে। যেহেতু তিনি যাহা করেন ইলহামের দ্বারাই করেন।

(১১) পীরের সামনে তার বিনা অনুমতিতে নফল নামাজ ও জিকিরে লিপ্ত হবে না এবং তার সামনে তিনি ব্যতিত অন্য দিকে লক্ষ্য হবে না। সম্পূর্ণ পীরের দিকে মনোনিবেশ করে বসে থাকবে। এমনকি জিকিরেও রত হবে না। কিন্তু তিনি যে আদেশ দেন তই করবে। ফরজ ও সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ ব্যতিত কোন নামাজই তার সামনে আদায় করবে না।
(১২) পীরের ধ্যান করতে হবে। রাবেতায়ে শায়খ মানে হলো পীর সাহেব যখন মুরীদ থেকে দূরে থাকেন। তখন মুরীদ তাজিম ও মহব্বতে তার গুনাবলীকে সামনে রেখে পীরের ধ্যান করলে তার সোহবতে থাকার ন্যায় ফয়েজ ও বরকত লাভ করতে সক্ষম হয়। (কওলিল জামিল কৃত, শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দেস দেহলভী রা:)

(১৩) পীরের প্রতি যার মহব্বত যত হবে তার সফলতাও তত বেশি হবে। আল্লাহর নৈকট্য লাভ করার জন্য এই পন্থাই সর্বোত্তম। অযোগ্য মুরীদ যখন পীরের সঙ্গে সীমাতিরীক্ত মহব্বতে বিভোর হয়ে পীরের ধ্যানে মগ্ন হয়ে পরে, তখন কামেল মুর্শিদ খোদা প্রদত্ত ক্ষমতা বলে মুরীদের মধ্যে যোগ্যতা সৃষ্টি করে দিয়ে থাকেন। (কওলুল জামিল)
(১৪) বেশি বেশি তাসাউরে বিশ শায়খ করবে। তাসাউরে শায়খ মানে হলো পীরের ধ্যান।
(১৫) যত বেশি সম্ভব পীর মুর্শিদের সোহবত লাভের সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে কেননা, আল্লামা জালাল উদ্দিন রুমী (রা:) বলেন, তুমি যদি আল্লাহর ওলীগণের দরবার হতে দূরে থাক, তাহলে প্রকৃত অর্থে আল্লাহর দরবার হতে দূরে সরে গেলে। আল্লাহ তায়ালা পাক কুরআনে বলেন– اِنَّ رَحْمَةَ اللهِ قَرِيْبٌ مِّنَ الْمُحْسِنِيْنَ
অর্থ: নিশ্চয়ই আল্লাহর রহমত নেককারদের (ওলীদের) নিকটবর্তী।
(১৬) তাফসীরে কানজুল ঈমানে সূরা কাহাফের ৭০ নাম্বার আয়াতের টিকায় বলেন, মুর্শিদের প্রতি মুরীদ বা শিষ্যের আদব সমূহের মধ্যে একথাও অন্তর্ভূক্ত যে, সে মুর্শিদের কার্যাদির উপর অভিযোগের মুখ খুলবে না বরং একথার অপেক্ষায় থাকবে যে, তিনি সেটার হিকমত বা রহস্য প্রকাশ করবেন। (তাফসীরে মাদারিক ও আবুস সাউদ)

(১৭) আদবটি হলো, তুমি তোমার নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দ পরিহার করবে। পীর কী চান বা কী পছন্দ করেন তা না জেনে মুরীদের কোন কাজই করার অনুমতি নেই চাই সেই কাজ হোক ধর্মীয় বা বৈষয়িক, আম (সার্বিক) কিংবা খাস (সুনির্দিষ্ট)। তার অনুমতি ছাড়া তুমি পানাহার করবে না, সুন্দর সুন্দর জামা কাপড় পরবে না, উপহার দেবে না, ঘুমাবে না, কিছু নেবেও না, দেবেও না। তোমার শায়খের অনুমতি ও নির্দেশ ছাড়া কোন ধর্মীয় কাজেও জড়াবে না। এক রাতে রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা:) এর বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, এমতাবস্থায় তিনি হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা:)-কে রাতের নামাজে নিচু স্বরে কুরআন তেলাওয়াত করতে শুনতে পেলেন। অত:পর তিনি হযরত উমর ফারুক (রা:) এর বাসার পাশ দিয়ে যাবার সময় তাকে রাতের নামাযে উচ্চস্বরে কুরআন তেলাওয়াত করতে শুনলেন। সকালে যখন উভয়েই রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে হাজির হলেন, তিনি হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা:)-কে জিজ্ঞেস করলেন কেন তিনি নিচু স্বরে কুরআন তেলাওয়াত করেছিলেন?

হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা:) উত্তর দিলেন, আমি যার সাথে আলাপ করি তার কথা শুনি। হযরত ওমর ফারুক (রা:)-কে তার উচ্চস্বরে কুরআন তেলাওয়াতের কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি উত্তর দেন, আমি শয়তানকে তাড়িয়ে দেই এবং যারা ঘুমায় তাদেরও জাগিয়ে দেই। অত:পর রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের দু’জনকে উচ্চস্বর বা নিচু স্বর কোনোটিতেই তা করতে বারণ করলেন। বরং মধ্যম রাস্তা অনুসরণ করতে বলেন। এমতাবস্থায় কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ হলো এবং আপন নামায না খুব উচ্চস্বরে পড়ো না একেবারে ক্ষীণ স্বরে এবং এই দু’য়ের মধ্যবর্তী পথ সন্ধান করো। (সূরা বনী ইসরাঈল আয়াত ১১০)

সুতরাং এতে প্রমাণিত হয় যে, তোমার যদি আধ্যাত্মিক পীর তথা পথ প্রদর্শক থাকেন তবে তোমার উচিৎ হবে না নিজের উপলব্ধি অনুযায়ী চলা। এটা আধ্যাত্মিক জগতের প্রকৃত উপলব্ধির বেলায়ও প্রযোজ্য হবে।

(১৮) আপন মুর্শিদ ব্যতিত অন্য কারো প্রতি মনোযোগী হবে না। সাধ্যমত স্বীয় জান ও মালের দ্বারা মুর্শিদের খেদমত করবে।
(১৯) মুর্শিদের কোন কাজ বাহ্যিক দৃষ্টিতে ভুল বলে মনে হলেও তার কার্যকে সঠিক বলে মানতে হবে। কারণ তিনি তা বিশেষ কারণে আল্লাহর নির্দেশেই করে থাকেন।
(২০) মুর্শিদের কোন বিষয়ের প্রতি কোন প্রকার আপত্তি করবে না। এতে খোদার অনুগ্রহ হতে বঞ্চিত হবে ও মুরীদের প্রাপ্ত ফয়েজ বন্ধ হয়ে যায় এবং মুর্শিদের মনে যে আবরণ পতিত হয়। তাতে চিকিৎসাহীন বস্তুতে পরিণত হয়ে যায়।
(২১) ক্ষুদ্র ও বৃহৎ যাবতীয় বিষয়ে মুর্শিদের আদেশের অনুকরণ করবে।
(২২) তিনি যেভাবে ইবাদত করেন বা করতে বলেন, সেভাবেই করবে।
(২৩) তার কার্যকলাপ দেখে শরীয়তের মাসায়েল শিখবে।
(২৪) নিজ পীরের ছেলে-মেয়ে ও পরিবারদেরকে পীরের হাত হিসাবে পীরের তুল্যই সম্মান করতে হবে। তাদের যোগ্যতা কামালিয়াতের বিচার করবে না।
(২৫) কখনো পীরের দোষত্রুটি অনুসন্ধান করবে না, যেহেতু সৃষ্টির মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট ঐ ব্যক্তি যে অলীগণের ত্রুটি অন্বেষণ করে।

(২৬) পীরের অনুমতি ব্যতিত তার নিকট হতে অন্যত্র যাবে না।
(২৭) প্রয়োজন ব্যতিত পীরের নিকট হতে বিদায় নিবে না।
(২৮) কথা বলার সময় পীরের আওয়াজের উপর মুরীদের আওয়াজকে উচ্চ করবে না। কারণ এটা নিতান্তই বেয়াদবী।
(২৯) আপন মুর্শিদের নিকট কখনও কোন কারামত দেখার আগ্রহী হবে না। যেহেতু কোন মুমিন কখনও খোদা প্রাপ্তি ব্যতীত কারামত প্রত্যাশী হয়নি।
(৩০) নিজের কারামত বা অলৌকিক শক্তি থাকলেও আপন মুর্শিদের সামনে কখনো তা প্রকাশ করবে না।
(৩১) মোরাকাবার মধ্যে কোন বিষয় অবগত হলে এবং ব্যাখ্যার প্রয়োজন বোধ করলে স্বীয় পীরের ব্যাখ্যা ব্যতীত অন্য কোন ব্যাখ্যা গ্রহণ করবে না।
(৩২) মুর্শিদ কাশফ দ্বারা মুরীদের অবস্থা অবগত হচ্ছেন। এই আশায় বসে না থেকে বরং নিজের অবস্থা মুর্শিদকে জানাবে।
(৩৩) মুরীদ নিজেকে সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট ও হীন মনে করবে।
(৩৪) কোন ফয়েজ বা অনুগ্রহ লাভ হলে তা পীরের বিশেষ তাওয়াজ্জুহ মনে করবে। যদি অন্য কোন পীর স্বপ্নযোগে ফয়েজ দান করেন, তাহলে তা আপন মুর্শিদ হতেই মনে করবে। কারণ মুর্শিদ মুরীদের যোগ্যতা অনুযায়ী বিভিন্ন ছুরতে ফয়েজ প্রদান করে থাকেন।

(৩৫) ইমদাদুস সুলুক নামক গ্রন্থের ১০ পৃষ্ঠায় মওলভী রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী লিখেছেন। যথা: মুরীদের এও দৃড়ভাবে বিশ্বাস করতে হবে যে, পীরের রুহ এক জায়গায় আবদ্ধ নয়। মুরীদ দুরে বা নিকটে যেখানে হোক না হোক না কেন, এমনকি পীরের পবিত্র শরীর থেকে দুরে হলেও পীরের রুহানিয়াত কিন্তু দুরে নয়। যখন এই ধারণা বদ্ধমুল হয়ে গেল। তখন পীরকে সর্বক্ষণ স্মরণে রাখতে হবে, যাতে তার সাথে আন্তরিক সম্পর্ক প্রকট হয়ে উঠে এবং মুরীদ এর উপকারিতা লাভে ধন্য হয়ে উঠে এবং মুরীদ এর উপকারিতা লাভে ধন্য হতে থাকে। মুরীদ যে অবস্থার সম্মুখীন হয়, সে অবস্থার পীরের মুখাপেক্ষী থাকে। পীরকে আপন অন্তরে হাযির করে স্বীয় অবস্থায় মাধ্যমে পীরের নিকট লক্ষ্য বস্তুর প্রার্থী হতে হবে। আল্লাহর হুকুমে পীরের রুহ পার্থিব বিষয়টি মুরীদের অন্তরে অবশ্যই ইলকা করবেন। কিন্তু এর জন্য শর্ত হচ্ছে পীরের সাথে পূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা। পীরের সহিত সম্পর্কের কারণেই অন্তরে বাক্যময় হয়ে উঠে, আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের পথ উদঘাটিত হয়, আল্লাহ তাকে ইলহাম প্রাপ্তির যোগ্যতা সম্পন্ন করে দেন।

(৩৬) কামেল পীরকে পরশমণি তুল্য জানিতে হইবে। তাহাকে যথেষ্ট ভাবিয়া তাহার হস্তে পূর্ণরূপে আত্মসমর্পন করবে, তাহার সন্তুষ্টি অসন্তুষ্টির মধ্যেই স্বীয় মঙ্গল অমঙ্গল জানিবে। নিজের যাবতীয় আকাঙ্খা তাহার ইচ্ছার অনুগত করিবে, যেন পীরের ইচ্ছার বিপরীত মুরীদের কোন স্পৃহা না থাকে। আদব সম্মান পালন করা আধ্যাত্মিক পথের অতি আবশ্যকীয় বস্তু অন্যথায় কোনই ফল ভাল হইবে না।
(৩৭) স্বীয় পীর ব্যতীত অন্য কোন পীরের প্রতি লক্ষ্য করিবে না।
(৩৮) পীর উপস্থিত থাকাকালীন তাহার অনুমতি ব্যতীত নফল ইবাদত ও জিকিরে লিপ্ত হইবে না।
(৩৯) পীরের সম্মুখে অন্য কাহারও প্রতি মনোযোগী হইবে না, পূর্ণরূপে পীরের দিকে লক্ষ্য রাখিবে এমনকি জিকির এর খেয়ালও করিবে না। কিন্তু তিনি আদেশ করিলে তখনই খেয়াল করিবে।
(৪০) ফরজ, ছুন্নত ব্যতীত তাহার সম্মুখে অন্য কোন প্রকার নামাজ আদায় করিবে না। যদি কোন অজিফা ইত্যাদি থাকে তবে তাহার নিকট হতে অন্যত্র সরিয়া যাইয়া পাঠ করিবে।
(৪১) পীরের কোন বস্তু বা অন্য কোন দ্রব্য তাহার তাবারুক হিসাবে প্রাপ্ত হইলে, তাহা অজু সহ ব্যবহার করা কর্তব্য এবং তাহার পরিধান করত জিকির মোরাকাবা করা আবশ্যক।

(৪২) হযরত মির্জা (রা:) তিনি তাহার পীরের টুপী তাবারুক প্রাপ্ত হইয়া ছিলেন। উক্ত টুপী তিনি রাত্রে ভিজাইয়া রাখিতেন এবং এতে তাহা মর্দন করত: তাহার মলীন পানি পান করিতেন। তিনি ফরমাইয়াছেন যে, ইহাতে যেরুপ বাতেন উন্নতি হইয়াছিল, তাহা তাহার অন্য কোন আমল দ্বারা সাধিত হয় নাই। (মোজাদ্দেদ আলফেসানী (রা:) মাকতুবাত শরীফের প্রথম খন্ড ২৯২)
(৪৩) পীরের কথা মনোযোগ সহকারে শুনা এবং তা আন্তরিকভাবে পালন করা। পীরের মজলিশে তাঁর কথা শুনার নিয়তে যাওয়া। নিজের কথা শুনানোর আগ্রহ নিয়ে না যাওয়া।
(৪৪) পীরকে কোন কথা জিজ্ঞেস করতে হলে আদব সুলভ ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করবে। আপত্তির ভঙ্গিতে কোন প্রশ্ন করবে না। কেননা পীরের কথায় আপত্তি ফায়েজের পরিপন্থী। যেমন, শায়খ শিহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দী আওয়ারিফুল মা’আরিফ গ্রন্থে বলেছেন, “যে ব্যক্তি পীরের জওয়াবের সম্মান করেনা সে পীরের বরকত হতে বিরত থাকবে। আর যে ব্যক্তি পীরের জওয়াবে না বলে দেয় সে কখনো সফলকাম হবে না।
(৪৫) পথ চলার সময় পীরের সামনে চলবে না। কারণ মুরব্বীর ইজ্জত সম্মান করার অর্থ, আল্লাহ ও রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সম্মান করা।
(৪৬) ইলমে তাসাউফ (ইলমে বাতিন) অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত মানুষ শিরকে খফি হতে বাঁচতে পারে না। শিরকে খফি হল রিয়া (লোক দেখানো ইবাদত)।
(৪৭) পীর কামেলের যথারীতি এক দিনের হুজরীর দ্বারা মুরীদের যে উপকার হয়, তা অসাক্ষাতে দশ বছরের মেহনত রিয়াযতেও তা হাছিল হয় না। আউলিয়ায়ে কেরামের এক মুহুর্ত ছোহবত রিয়াহীন একশত বৎসরের ইবাদত অপেক্ষা শ্রেয়।

(৪৮) পীরের সকল আদেশ এবং চাল চলনের পুরোপুরি তাবেদার হওয়া কর্তব্য। মুরীদের কাছে পীরের মোহব্বত এ পরিমাণ হওয়া উচিত যেন পীর রোগাক্রান্ত হলে মুরীদ নিজের মধ্যে রোগের অনুভূতি পায়।
(৪৯) এমন কোন কাজ করতে বলা উচিত নয় যা মুর্শিদকে আদেশ মূলক হয়।
(৫০) মুর্শিদ এর অনুমতি ব্যতিত কোন কথা বলা উচিত নয়।
(৫১) মুর্শিদের মুখে মুখে কথা বলা উচিত নয় এবং মুর্শিদের মুখের কথা কেড়ে নিজে বলতে শুরু করা আদবের চরম খেলাফ।
(৫২) নবীয়ে দু’জাহানের ছাহাবীগণ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যেভাবে ভালবাসতেন মুরিদগণ পীরে সেভাবে ভালবাসতে হবে।
(৫৩) মুর্শিদের উপস্থিতিকে সেভাবে মূল্যায়ন করতে হবে, যেভাবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপস্থিতিকে সাহাবাগণ মূল্যায়ন করতেন।
(৫৪) মাকতুবাতে ইমাম রাব্বানী কিতাবে লিখিত আছে, নিজের পীর হতে অন্য পীরকে ভালো মনে করলে নিজ পীরের ফয়েজ লাভ হবে না।
(৫৫) কোন ঘটনা উদ্ভব হলে তখনই তা পীরের নিকট আরজ করবে পীর উক্ত বিষয়ে যা ব্যাখ্যা করেন, তাই মেনে নিবে। মুরিদ নিজ কাশফ বা ইলহামের উপর কোনরূপ ভরসা করবে না।
(৫৬) মুরীদের ফয়েজ বরকত যা কিছু লাভ হয় তা পীরের উছিলায় লাভ হয়েছে বলে মনে করবে। মোট কথা, পীরের প্রতি আদবই হলো তরিকার নিয়ামত প্রপ্তির প্রধান উপায়।
(৫৭) মুরিদ যদি পীরের প্রতি আদবের দিকে খেয়াল না করে এবং পীরের কাছে ত্রুটি এবং অক্ষমতাও প্রকাশ না করে তবে সে পীরের নেয়ামত প্রাপ্তি থেকে বিরত থেকে যাবে। এরূপ নূরুল আলা নূর কিতাবে আছে।

জামেউল উছুল কিতাবে নিন্মের আদব সমূহ উল্লেখ করা আছে-
(৫৮) প্রকাশ্যে পীরের সাথে কথা বলা বা কাজের সমালোচনা করা বা তার বিপরীতভাব পোষন করা নিজের ধ্বংস এবং অকল্যাণ ডেকে আনা ছাড়া আর কিছু নয়।

উল্লিখিত বিষয়গুলো শুধু কিতাবে লেখা নীতির মাধ্যমেই সমাধান হয় না। জ্ঞান অনুসন্ধান, মোর্শেদের দরবারের নীতি ও মোর্শেদের তবিয়ত জানতে হবে এবং তদনুযায়ী আদব-কায়দা গঠন করতে হবে। অনেক সময় আদব রক্ষা করতে গিয়ে মুরিদ বেয়াদবি করে থাকে। কারণ মোর্শেদ অবস্থাভেদে মুরিদকে প্রয়োজন মতো হুকুম করলে মুরিদের তা করতে ইতস্তত করা আদবের খেলাফ।

মোর্শেদের আদব রক্ষায় কোনো সময় মুরিদগণ বাড়াবাড়ি করতে গিয়ে, মোর্শেদের বিরক্তির কারণ হয়ে থাকে। এতে মূলে বেয়াদবি হয়ে যায়। মোর্শেদের আওলাদ-ফরজন্দকে মোর্শেদের জাত হিসেবে মোর্শেদের সম্মানে সম্মান করতে হবে। কেননা, তাঁদের যোগ্যতা কামালিয়াতের বিচার করবেন না। মোর্শেদের আত্মীয়-স্বজনদের শ্রদ্ধা করবেন। মোর্শেদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার দোহাই দিয়ে তাঁর নিকট মর্যাদা তলব করা কিংবা এমন কোনো ব্যবহার পাওয়ার আশা করাও আদবের খেলাফ।

আদাবুল মুরিদ সম্পর্কিত উল্লিখিত আলোচনা থেকে সুস্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, মোর্শেদের দরবারে গোলামি করে হৃদয়ে আল্লাহর প্রেম জাগ্রত করতে হয়। কঠোর সাধনার দ্বারা শত বছরে যা অর্জন করা যায় না, কামেল মোর্শেদের সংস্পর্শে আদবের সাথে এক মুহূর্ত অবস্থান করলে এর অধিক নেয়ামত লাভ করা যায়।

জগৎবিখ্যাত সুফিসাধক হযরত জালাল উদ্দিন রুমী (রহ.) বলেন-

‘‘এক জামানা সোহবতে বা আউলিয়া, বেহেতের আয সাদ সালাতাতে বেরিয়া।’’

অর্থাৎ-এক মুহূর্ত কোনো আল্লাহর অলীও সোহবতে থাকা একশত বছর বেরিয়া (নিরহংকার) ইবাদতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ।

কামেল মোর্শেদের নিকট আদবের সাথে বসে তাঁর নুরানিময় চেহারা মোবারকের দিকে প্রেমের দৃষ্টিতে এক নজরে তাকালে মোর্শেদের দিল হতে নুর মুরিদের দিলে বর্ষিত হতে থাকে। ফলে মুরিদের দিলের কু-প্রবৃত্তি ও বাজে চিন্তাসমূহ দূর হয়ে যায়। আমার মহান মোর্শেদ মহান সংস্কারক মুহাম্মদী তরিকার প্রবত্যক হজরত শায়েখ জুলফিকার রহমান বিপ্লব মুহাম্মাদি হুজুর কেবলাজানের মহাপবিত্র কদম মোবারকে এ আর্জি তিনি যেন দয়া করে তাঁর দরবারে আমাদের সবাইকে আদব রক্ষা করে চলার সুযোগ করে দেন। আমিন

পীরের প্রতি মুরীদের পালিত আদব -২

জেনে রাখ: মুরীদের জন্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়মগুলোর একটি হলো তার শায়খ তথা পীরের প্রতি আদবশীলতা রক্ষার ব্যাপারে যত্নবান হওয়া; কেননা, এই আচরণ-সচেতনতা অন্তরে ভালবাসা সৃষ্টি করে। এটা বাস্তব যে তোমার আচার-ব্যবহারের সৌন্দর্যের মাঝে তোমার আত্মার সৌন্দর্য ও তোমার মেধা বা বুদ্ধিবৃত্তির পূর্ণতা দৃশ্যমান হয়। তুমি সর্বদা তোমার শায়খের প্রতি আদবশীল হলে তাঁর অন্তরে তোমার প্রতি ভালবাসা পয়দা হবার ফলে সেখানে তোমার একটি স্থানও নির্দিষ্ট হবে; আর এরই ফলশ্রুতিতে খোদা তা’লার করুণাও তোমার প্রতি বর্ষিত হবে। মহান আল্লাহ্ পাক তাঁর বন্ধু (ওলী)-দের অন্তরগুলোতে রহমত (করুণা) ও যত্নের দৃষ্টি রাখেন। মুরীদ যদি পীরের অন্তরে স্থায়ী আসন করে নিতে পারে, তবে স্থায়ী খোদায়ী করুণা ও আশীর্বাদ তারই প্রাপ্য হবে। তোমার শায়খ কর্তৃক তোমাকে কবুল করার চিহ্ন হবে এই যে তোমার প্রতি তাঁর আর কোনো আপত্তি থাকবে না, যা আল্লাহ্, তাঁর রাসূল (দ:) ও সকল পীর-মাশায়েখ যাঁরা তোমার শায়খ ও রাসূলুল্লাহ্ (দ:)-এর মধ্যকার সিলসিলাগত যোগসূত্র, তাঁদের কাছে তোমার কবুল হবার সুস্পষ্ট প্রমাণ।

শুধু সুন্দর আদব-কায়দা ও আচরণ দ্বারাই তোমার পীরের প্রতি কিছু কিছু দায়িত্ব পালন করা যায়। ধর্মীয় জ্ঞান বিশারদ তথা পীর মাশায়েখবৃন্দ যাঁরা তোমাদের রূহানী পিতা, তাঁদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে তোমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য সম্পন্ন করো; এতে অবহেলা চরম অবজ্ঞা ও অমান্য করার প্রবণতা ছাড়া আর কিছু নয়। একটি হাদীসে আমাদের মহানবী (দ:) এরশাদ ফরমান- “যে ব্যক্তি মরুব্বীদের সম্মান করে না এবং ছোটদের আদর করে না এবং উলামায়ে হক্কানী-রব্বানীদের হক তথা অধিকার স্বীকার করে না, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।” তুমি যদি তোমার শায়খের অধিকারকে অবহেলা করো, যিনি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তাঁর অধিকার দ্বারা আল্লাহ্ তা’লার অধিকারের প্রতিনিধিত্ব করেন, তবে তুমি খোদা তা’লার প্রতি কর্তব্য পালনেও ব্যর্থ হবে; কেননা, “তোমার মুরশিদের প্রতি কর্তব্যে অবহেলা করলে তুমি আল্লাহর কাছে পৌঁছুতে পারবে না।” একজন শায়খ তাঁর মুরীদানদের মধ্যে সেই রকম হেদায়াতকারী যেমনটি নবী (দ:) তাঁর উম্মতের মাঝে। যখন পীর সাহেব তোমাকে রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর পথ অনুসরণের আহ্বান জানান, তখন তিনি বিশ্বনবী (দ:)-এর প্রতিনিধি। যথা- এরশাদ হয়েছে:

”আশ্ শায়খু ফী কওমিহী কান্ নবীয়্যে ফী উম্মাতিহী”

অর্থাৎ, “একজন পীর তাঁর (অনুসারী সিলসিলাধারী) মুরীদানদের জন্যে সেই রকম হেদায়াতকারী, যেমনটি নবী (দ:) তাঁর উম্মতের মাঝে।”

আমার জ্ঞানে বর্তমানে মুরীদের জন্যে পনেরোটি আদব রয়েছে যা সে তার পীরের প্রতি পালন করবে। এ আদবগুলো একাধারে আম (সার্বিক) ও খাস্ (সুনির্দিষ্ট) উভয়ই।

প্রথম আদবটিতে এই বিশ্বাস ব্যক্ত হয়েছে যে তোমার জ্ঞান অর্জন, হেদায়েত (পথ প্রদর্শন), প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা-দীক্ষা সবই তোমার পীর দেখা শোনা করবেন। তুমি যদি কাউকে তাঁর সাথে তুলনীয় মনে করো বা ওই ব্যক্তিকে আরও পূর্ণতাপ্রাপ্ত মনে করো, তাহলে বোঝা যাবে তোমার শায়খের সাথে তোমার ভালবাসা ও টানের সম্পর্ক দুর্বল এবং এই কারণেই তোমার পীরের কথা ও তাঁর আধ্যাত্মিক হাল বা অবস্থাগুলো তোমার ওপর সামান্য প্রভাব ফেলবে। তাঁর কথা ও আদেশকে তোমার ওপর প্রভাব ফেলতে হলে এবং তাঁর হালতগুলোকে তোমার উপলদ্ধি করতে হলে যে জিনিসটি প্রয়োজন তা হলো মুহব্বত (ভালবাসা)। তোমার ভালবাসা যতো বেশি পূর্ণতা পাবে ও গভীর হবে ততোই তাঁর শিক্ষাগুলো তোমার বোধগম্য হতে থাকবে।

দ্বিতীয় আদবটি হলো তোমার শায়খের আদেশ-নিষেধ মান্য করার বেলায় তোমার স্থির সিদ্ধান্ত ও অটল থাকা। তোমার এটা জানা উচিৎ যে, তাঁকে মানা ও তাঁর খেদমতে ধারাবাহিকতা বজায় রাখার মাঝেই খোদায়ী করুণার দ্বার অবারিত হবে। ‘হয় আমি পীরের দোরগোড়ায় জান দেবো, নয়তো লক্ষ্যে পৌঁছাবো।’ এর লক্ষণ হলো, যখন পীর সাহেব তোমাকে কোনো বিষয়ে ‘না’ বলেন বা দূরে সরিয়ে দেন, তখন তুমি তাঁর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে না। কেননা, তোমার আধ্যাত্মিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করার জন্যে সময়ে সময়ে তিনি তোমাকে পরীক্ষা করবেন।

আবু উসমান হিরী (বেসাল ২৯৮ হিজরী/৯৬০-১১ খৃষ্টাব্দ; খোরাসানী সূফীদের নক্ষত্র) তাঁর পীর শাহ কেরমানী (বেসাল ৩০০ হিজর/৯১২-১৩ খৃষ্টাব্দ; আবু তোরাব নক্শাবীর মুরীদ)-এর আদেশ অনুসারে আবু হাফসে হাদ্দাদ (বেসাল ২৭০ হিজরী/৮৮৩-৪ খৃষ্টাব্দ বা তারও আগে; তিনি মালামাতিয়া তথা দায় বহনের তরীকার অনুসারী)-কে দেখতে নিশাপুরে আসেন। আবু হাফসে হাদ্দাদের ঐশী পরশময় চাহনি আবু উসমানকে এতোই আকর্ষণ করলো যে তিনি তাঁর জালে আটক হয়ে গেলেন। নিশাপুর থেকে ফেরার সময় হলে আবু উসমান তাঁর পীর শাহ কেরমানীর কাছে নিশাপুরে থাকার অনুমতি চান। এ সময় তিনি তাঁর পূর্ণ যৌবনে ছিলেন। আবু হাফস্ হাদ্দাদ অবশ্য তাঁকে দূরে সরিয়ে দিলেন এ কথা বলে, “আমার সোহবতে (সান্নিধ্যে) বসার কোনো অনুমতি তোমার নেই।” আবু উসমান এই সিদ্ধান্ত মেনে তাঁকে সামনে রেখে পেছনের দিকে হেঁটে বেরিয়ে এলেন যতোক্ষণ না শায়খ আবু হাফস্ দৃষ্টির বাইরে চলে গেলেন। অতঃপর আবু উসমান শায়খের দরজার বাইরে একটি গর্ত খুঁড়ে সেখানে বসে গেলেন এই নিয়্যতে যে আবু হাফস্ তাঁকে না গ্রহণ করা ও না ডাকা পর্যন্ত তিনি সেখান থেকে নড়বেন না। আবু হাফস্ তাঁর এ নিষ্ঠাপূর্ণ নিয়্যত দেখে তাঁকে কাছে ডাকলেন ও তাঁর বিশেষ সঙ্গীদের একজন হিসেবে তাঁকে গ্রহণ করলেন; অতঃপর তাঁকে নিজ কন্যার সাথে বিয়ে দিলেন ও উত্তরাধিকারী হিসেবে খেলাফত দান করলেন। শায়খের বেসালের পরে আবু উসমান ত্রিশ বছর সাজ্জাদানশীন খলীফা ছিলেন।

তৃতীয় আদবটি হলো, তোমার শায়খের পছন্দ-অপছন্দের মাঝে নিজেকে তুমি সমর্পিত করবে। মুরীদ হিসেবে তোমার ব্যক্তিগত বিষয়ে কিংবা মালিকানাধীন সম্পদের ব্যাপারে তোমার পীরের প্রতিটি সিদ্ধান্ত তোমাকে মেনে চলতে হবে এবং এতে সমর্পিত ও সন্তুষ্ট থাকতে হবে। এটাই একমাত্র পথ যা দ্বারা তুমি তাঁর অমূল্য মনোযোগ আকর্ষণ ও ভালবাসা অর্জন করতে সক্ষম হবে। তোমার আন্তরিকতা ও নিষ্ঠা পরিমাপের এটাই হলো মাপকাঠি – যেমনিভাবে আল্ কুরআনে বিবৃত হয়েছে- “অতএব, হে মাহবুব! আপনার প্রতিপালকের শপথ, তারা মুসলমান হবে না যতোক্ষণ পরস্পরের ঝগড়ার ক্ষেত্রে আপনাকে বিচারক না মানবে; অতঃপর যা কিছু আপনি নির্দেশ করবেন, তাদের অন্তরসমূহে সে সম্পর্কে কোনো দ্বিধা থাকবে না এবং সর্বান্তঃকরণে তা মেনে নেবে” (সুরা নিসা, ৩৫ আয়াত)।

চতুর্থ আদব শর্তারোপ করে যে তুমি তোমার পীরের সমালোচনা করবে না। নিজ পীরের পছন্দ-অপছন্দ ও সিন্ধান্তগুলোর সমালোচনায় প্রবৃত্ত হওয়া মুরীদের উচিৎ নয়- তা অন্তরে হোক বা প্রকাশ্যেই হোক। তোমার পীরের কোনো কিছু অস্পষ্ট মনে হলে সর্বদা মূসা (আ:) ও খিযির (আ:)-এর ঘটনাটির কথা স্মরণ করবে (সূরা কাহাফ, ৬০-৮২ আয়াতসমূহ)। এতে বর্ণিত হয়েছে যে হযরত মূসা (আ:) আল্লাহর নবী ও মহাজ্ঞানী এবং খিযির (আ:)-এর প্রতি ভক্ত-অনুরক্ত হওয়া সত্ত্বেও তাঁর কিছু কাজের সামলোচনা করেছিলেন; কিন্তু ওগুলোর অন্তর্নিহিত অর্থ জানার পর নিজ ধারণা পরিবর্তন করেছিলেন। তোমার শায়খের কোনো কাজ যদি তোমার বোধগম্য না হয়, তবে তোমার বলা উচিৎ যে তোমার উপলব্ধি ক্ষমতা ও জ্ঞান সীমাবদ্ধ; আর এটি কোনোক্রমেই তোমার পীরের ভুল-ত্রুটি বা ভ্রান্ত আচরণের ব্যাপার নয়। ফলে তোমার পীরের সাথে তোমার সম্পর্কে ফাটল ধরার সম্ভাবনা থেকে তুমি মুক্ত থাকবে এবং তাঁর মুহব্বতেও ঘাটতি পড়বে না। একবার হযরত জুনাইদ বাগদাদী (রহ: – বেসাল ৯১০ খৃষ্টাব্দ)-কে জনৈক মুরীদ একটি প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে এবং তাঁর উত্তর পাবার পরে এর সমালোচনা করে। হযরত জুনাইদ (রহ:) তখন কুরআন মজীদের একটি আয়াতে করীমা পড়ে শোনান:

”আর তোমরা যদি আমাকে বিশ্বাস না করো, তাহলে আমার কাছ থেকে সরে যাও” (সূরা দুখান, ২১ আয়াত)।

পঞ্চম আদবটি হলো, তুমি তোমার নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দ পরিহার করবে। পীর কী চান বা কী পছন্দ করেন তা না জেনে মুরীদের কোনো কাজই করার অনুমতি নেই- চাই সেই কাজ হোক ধর্মীয় বা বৈষয়িক, আম (সার্বিক) কিংবা খাস (সুনির্দিষ্ট)। তাঁর অনুমতি ছাড়া তুমি পানাহার করবে না, সুন্দর সুন্দর জামাকাপড় পরবে না, উপহার দেবে না, ঘুমোবে না, কিছু নেবেও না, দেবেও না। তোমার শায়খের অনুমতি ও নির্দেশ ছাড়া কোনো ধর্মীয় কাজেও জড়াবে না। এক রাতে রাসূলে পাক (দ:) হযরত আবু বকর (রা:)-এর বাসার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন; এমতাবস্থায় তিনি হযরত আবু বকর (রা:)-কে রাতের নামাজে নিচু স্বরে কুরআন তেলাওয়াত করতে শুনতে পেলেন। অতঃপর তিনি হযরত উমর (রা:)-এর বাসার পাশ দিয়ে যাবার সময় তাঁকে রাতের নামাযে উচ্চস্বরে কুরআন তেলাওয়াত করতে শুনলেন। সকালে যখন উভয়েই রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর দরবারে হাজির হলেন, তিনি হযরত আবু বকর (রা:)-কে জিজ্ঞেস করলেন কেন তিনি নিচু স্বরে কুরআন তেলাওয়াত করেছিলেন। হযরত আবু বকর (রা:) উত্তর দিলেন, “আমি যাঁর সাথে আলাপ করি তাঁর কথা শুনি।” হযরত ওমর (রা:)-কে তাঁর উচ্চস্বরে কুরআন তেলাওয়াতের কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিন উত্তর দেন, “আমি শয়তানকে তাড়িয়ে দেই এবং যারা ঘুমোয় তাদেরও জাগিয়ে দেই।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (দ:) তাঁদের দু’জনকে উচ্চস্বর বা নিচু স্বর কোনোটিতেই তা করতে বারণ করলেন বরং মধ্যম রাস্তা অনুসরণ করতে বল্লেন। এমতাবস্থায় কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ হলো- “এবং আপন নামায না খুব উচ্চস্বরে পড়ো, না একেবারে ক্ষীণ স্বরে এবং এই দুয়ের মধ্যবর্তী পথ সন্ধান করো” (সুরা বনী ইসরাইল, ১১০ আয়াত)। এতে প্রমাণিত হয় যে তোমার যদি আধ্যাত্মিক পীর তথা পথপ্রদর্শক থাকেন, তবে তোমার উচিৎ হবে না নিজের উপলব্ধি অনুযায়ী চলা। এটা আধ্যাত্মিক জগতের প্রকৃত উপলদ্ধির বেলায়ও প্রযোজ্য হবে।

যষ্ঠ আদবটি হলো, তোমার শায়খের চিন্তাধারাকে মেনে চলতে হবে। শায়খের চিন্তা-ভাবনাকে প্রত্যাখ্যান করে, এমন কোনো কিছুতে মুরীদের ব্যাপৃত হওয়া উচিৎ নয়। তাঁর চিন্তা-ভাবনাকে কম গুরুত্বপূর্ণ মনে করা তোমার উচিৎ নয়। কেননা, তোমার শায়খের দয়া, সম্পূর্ণ ক্ষমা, বন্ধুত্ব ও ক্ষমাশীলতার ওপর তুমি নির্ভরশীল। শায়খের সচেতন মনে প্রত্যাখ্যান কিংবা গ্রহণের কারণে যা কিছু প্রবেশ করে তা মুরীদের সত্তার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।

সপ্তম আদব তোমার কাছে এটা দাবি করে যে তুমি স্বপ্নে যা দেখ তা তুমি তোমার পীরকে বলবে ও সেগুলোর ব্যাখ্যা চাইবে। স্বপ্নের ব্যাখ্যার ব্যাপারে পীরের ওপর নির্ভর করবে; হতে পারে এসব স্বপ্ন জাগ্রত অবস্থায় কিংবা ঘুমে। এগুলোতে কোনো ক্ষতি নেই মর্মে নিজে নিজে সিদ্ধান্ত নেবে না। এ সব স্বপ্ন হয়তো তোমার আত্মার গোপন আকাঙ্ক্ষা থেকেও সম্ভব হতে পারে এবং তুমি সেগুলোকে সেভাবে বিচার নাও করতে পারো ও ক্ষতিকর নাও মনে করতে পারো। এটা প্রকৃত চিত্র নাও হতে পারে। তবে তুমি যখন তোমার পীরকে এগুলো সম্পর্কে বলবে এবং তিনি তাঁর সুগভীর জ্ঞান দ্বারা এগুলোর সাথে পরিচিত হবেন, তখন বাস্তবিকভাবে এগুলো কখন ক্ষতিকর নয় তা বুঝতে তোমার পীরের মতামত তোমাকে সাহায্য করবে। এটা যখন আঘাতের ইঙ্গিত বহন করবে, তখন তাও বোঝা যাবে।

অষ্টম আদবটি তোমার কাছে এটা দাবি করে যে তুমি তোমার পীরের কথা কান দিয়ে শুনবে। শায়খের ঠোঁট থেকে যা বের হয়ে আসবে তা শোনার জন্যে মুরীদের উচিৎ অপেক্ষা করা ও তাতে মনোযোগী হওয়া। তার উচিৎ নিজ শায়খের জিহ্বাকে খোদা তা’লা ভাষণের অভিব্যক্তি মনে করা এবং এই বিশ্বাস পোষণ করা যে তিনি নিজ আকাঙ্ক্ষা হতে কিছু বলেন না বরং যা বলেন তা “খোদা বান্দার মাধ্যমে কথা বলেন” এমন মাকামে উন্নীত হয়েই ব্যক্ত করেন। তোমার উচিৎ তাঁর হৃদয়কে আধ্যাত্মিক জ্ঞানের মণিমুক্তাসমৃদ্ধ একটি মহাসাগর মনে করা; যে মহাসাগর প্রাক-অনন্তকালের খোদায়ী ইচ্ছার বায়ুপ্রবাহে এ সব রত্নের কিছু কিছুকে পীরের সৈকতসম জিহ্বায় ভাসিয়ে নিয়ে আসে।

অতএব, তোমার উচিৎ এ ব্যাপারে যত্নবান ও মনোযোগী হওয়া যাতে করে তোমার জন্যে উপকারী হতে পারে পীরের এমন কথা শোনা থেকে তুমি বঞ্চিত না হও।

তোমার নিজের হাল তথা অবস্থার সাথে তোমার পীরের প্রতিটি কথাকে তুমি সমন্বয় সাধন করতে চেষ্টা করবে। এ কথা তুমি চিন্তা করবে যে খোদার দরবারে তোমার কল্যাণের জন্যে তুমি একটি দরখাস্ত পেশ করছো গ্রহণোম্মুখ জিহ্বা সহকারে; আর এই গ্রহণোম্মুখতার পরিপ্রেক্ষিতে গায়েব থেকে তোমার প্রতি একটি ভাষণ অবতীর্ণ হয়েছে। নিজ পীরের সাথে কথা বলার সময় তুমি নফসানীয়াত (একগুঁয়ে সত্তা) ত্যাগ করবে; নিজ জ্ঞান ও ঐশী অন্তর্দৃষ্টিকে সদ্ব্যবহার করে তোমার উচিৎ হবে কপটতা ত্যাগ করা এবং নিজেকে পূর্ণ ও সুন্দর হিসেবে পেশ করা। কেননা, যখন তুমি নিজেকে ব্যক্ত করতে চেষ্টা করবে ও কথা বলার সুযোগের অপেক্ষায় থাকবে, তখনই তুমি নিজেকে মুরীদের অবস্থান থেকে সরিয়ে ফেলবে এবং শায়খের কথা শোনার ক্ষেত্রে নিজেকে বধির বানিয়ে ফেলবে। কুরআনের আয়াত-

’হে ঈমানদারবৃন্দ! আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (দ:)-এর আগে বেড়ো না’ (সূরা হুজুরাত, ১ম আয়াত)। এ আয়াতের শানে নুযূল তথা প্রেক্ষাপট হিসেবে কিছু কিছু তফসীরকার লিখেছেন যে রাসূলে খোদা (দ:)-এর সাহচর্যে এমন কিছু মানুষ ছিলেন যারা হুজুর পাক (দ:)-কে কেউ কোনো প্রশ্ন করলে উত্তর হিসেবে নিজেদের মতামত পেশ করার অভ্যাস গড়ে তুলেছিলেন। এ আয়াত অবতীর্ণ হয়ে তা যে ভুল ও নিষিদ্ধ তা প্রমাণ করেছে।

নবম আদবটি শর্তারোপ করে যে তুমি তোমার কণ্ঠস্বর পীরের উপস্থিতিতে নিচু ও মোলায়েম রাখবে। তাঁর সান্নিধ্যে কখনো উচ্চস্বরে কথা বলবে না; কেননা এটা সৌজন্যের খেলাফ। এটা আপন মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত করার মতোই ব্যাপার। এ শিক্ষাটা দেয়ার জন্যেই কুরআনের আয়াত নাযেল হয়েছে- “হে ঈমানদারবৃন্দ! নিজেদের কণ্ঠস্বরকে ওই অদৃশ্যের সংবাদদাতা (নবী)-র কণ্ঠস্বরের চেয়ে উঁচু করো না” (সূরা হুজুরাত, ২য় আয়াত)। অতঃপর সাহাবায়ে কেরাম তাঁদের কণ্ঠস্বর এতোই নিচু করেন যে তাঁদের কথাবার্তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় কুরআনের আয়াত নাযেল হয়- “নিশ্চয় ওই সমস্ত মানুষ যারা আপন কণ্ঠস্বরকে আল্লাহর রাসূলের দরবারে নিচু রাখে, তাদেরকে আল্লাহ পাক তাদের খোদাভীরুতার বেলায় পরীক্ষা করে নিয়েছেন; তাদের জন্যে ক্ষমা ও মহা পুরস্কার রয়েছে” (সূরা হুজুরাত, ৩য় আয়াত)।

দশম আদবটি তোমাকে তোমার আচরণে অবহেলা প্রদর্শন করতে বারণ করে। তোমার শায়খের সাথে কথায় বা কাজে খুব ফ্রি বা খোলামেলা আচরণ অনুমতিপ্রাপ্ত নয়; কেননা তাতে বিনয়ীভাব তিরোহিত হবে এবং যথাযথ আচরণও দূর হয়ে যাবে এবং এরই ফলশ্রুতিতে করুণা প্রবাহও বিঘ্নিত হবে। তোমার উচিৎ হবে তাঁকে সম্মানসহ সম্বোধন করা, যেমন- ইয়া শায়খী (হে আমার পীর) ইত্যাদি।

মহানবী (দ:)-এর সাহাবায়ে কেরাম প্রথম দিকে তাঁকে সম্বোধনের সময় সম্মানসহ তা করতেন না। তাঁরা বলেতন ‘মোহাম্মদ’ কিংবা ‘আহমদ’ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)। এমতাবস্থায় এটা নিষেধ করে কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ হয়: “রাসূল (দ:)-কে সম্বোধন করার সময় সেভাবে চিৎকার করো না যেভাবে একে অপরের প্রতি করে থাকো, যাতে তোমাদের আমলসমূহ বরবাদ না হয়ে যায়” (সূরা হুজুরাত, ২ নং আয়াত)। অতঃপর সাহাবায়ে কেরাম তাঁকে ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ্’ (হে আল্লাহর রাসূল) বলে সম্বোধন করতেন। বানু তামীম গোত্রের কতিপয় প্রতিনিধি একবার মহানবী (দ:)-এর ঘরের সামনে গিয়ে জোরে চিৎকার দিয়ে বলে, “হে মোহাম্মদ! আামদের কাছে বেরিয়ে আসুন!” এতে কুরআনের আয়াত নাযেল হয়- “নিশ্চয় ওই সব লোক যারা আপনাকে হুজরাসমূহের (প্রকোষ্ঠ) বাইরে থেকে আহ্বান করে তাদের মধ্যে অধিকাংশই নির্বোধ এবং যদি তারা ধৈর্য ধারণ করতো আপনি তাদের কাছে বের হওয়া পর্যন্ত, তবে তা তাদের জন্যে ভাল হতো।” (সূরা হুজুরাত, ৪-৫ আয়াত)। তোমার পীরের সাথে কথাবর্তা বলার সময় যেমন তুমি খোলামেলা হবে না, তেমনি কাজে কর্মেও তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করাকে তোমার কর্তব্য মনে করবে। তাই পীরের দরবারে তোমার জায়নামাজ শুধু নামাযের সময় হলেই বিছিয়ে দেবে। তাঁর সামনে সূফীবৃন্দের সেমা (কাওয়ালী/মরমী সংগীত) শোনার সময় যতোক্ষণ তোমার নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে, ততোক্ষণ চিৎকার বা ওয়াজদ (দৈনিক স্পন্দন) করবে না। হাসাহাসিও করবে না।

এগারোতম আদব তোমার প্রতি শর্তারোপ করে যে, কথা বলার সঠিক সময়টুকু তোমার জানা প্রয়োজন। মুরীদ যখন ধর্মীয় বা বৈষয়িক গুরুত্বপূণ বিষয় সম্পর্কে আলাপ করতে চায়, তখন তার উচিৎ এটা দেখে নেয়া যে তার পীর এ ব্যাপার তার মূল্যবান সময় দিতে রাজি আছেন কিনা; অর্থাৎ, তিনি মুরীদের কথা শুনতে ইচ্ছুক কিনা। তোমার শায়খের সাথে কথা বলার সময় তোমার তাড়াহুড়ো করা উচিৎ নয়। আল্লাহর অনুগ্রহ ও করুণা কামনা করো যাতে করে আদব পালনের ক্ষেত্রে কোনো ভুল-ত্রুটি না হয়ে যায়, কোনো বেয়াদবী না হয়ে যায়। এ সময় খোদা তা’লার এতো নিকটবর্তী হওয়ার কারণে পীরের দরবারে হাদিয়া পেশ করা যথোচিৎ হবে। মহানবী (দ:)-এর দরবারেও তাঁর সাহাবায়ে কেরাম তাঁর কাছে কিছু আরয করার আগে এ রকম হাদিয়া পেশ করতেন, যেমনিভাবে কুরআন মজীদে ঘোষিত হয়েছে; “হে ঈমানদারবৃন্দ! তোমরা যখন রাসূল (দ:)-এর কাছে কোনো কথা গোপনে আরয করতে চাও, তবে তা করার আগে কিছু সাদকাহ্ (হাদিয়া) পেশ করো (রাসূলের কাছে)” (সূরা মুজাদালা, ১২ আয়াত)।

উপরোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসীরকার শিরোমণি হযরত ইবনে আব্বাস (রা: বেসাল- ৬৮৭/৯০ খৃষ্টাব্দ) বলেন: “এ আয়াতটি অবতীর্ণ হবার কারণ হলো মানুষেরা হুজুর পূর নূর (দ:)-এর দরবারে হাজির হয়ে মাত্রাতিরিক্ত পীড়াপীড়িমূলক প্রশ্ন করতো এবং তাঁকে পেরেশান করতো।”

বারোতম আদব দাবি করে যে তুমি তোমার আধ্যাত্মিক মকামের সীমানাগুলো পাহারা দেবে। পীরকে প্রশ্ন করার সময় মুরীদের উচিৎ নিজ মকামের সীমা বজায় রাখা। শুধু তোমার আধ্যাত্মিক অবস্থা-সম্পর্কিত তোমার কাছ থেকে গোপন বা আড়াল যে কোনো বিষয় সম্পর্কেই তুমি তাঁর কাছে ব্যাখ্যা চাইতে পারবে। অন্যান্য বিষয় সম্পর্কে প্রশ্ন করো না; এটা তোমার মকাম বা হালের সাথে সম্পর্কিত এমন বিষয়গুলোর বেলায়ও প্রযোজ্য। অতএব, এগুলো সম্পর্কে পীরের সাথে আলাপ করো না; কেননা এগুলো উপকারী নয়, এমন কি ক্ষতিকরও হতে পারে। তোমার আধ্যাত্মিক অবস্থার সাথে যা কিছু জড়িত শুধু সে সম্পর্কেই প্রশ্ন করবে। এ ধরনের বাহুল্য প্রশ্নের ব্যাপারে কুরআন মজীদে এরশাদ হয়েছে- “হে ঈমানদারবৃন্দ! তোমরা এমন সব বিষয়ে প্রশ্ন করো না, যেগুলো তোমাদের কাছে প্রকাশ করা হলে তোমাদের খারাপ লাগবে” (সূরা মাঈদাহ, ১০১ আয়াত)। উপকারী কথা হলো তা-ই যা শ্রোতার উপলব্ধি ক্ষমতার অনুকূল। আর উপকারী প্রশ্ন হলো তা-ই যা উত্তর শ্রবণকারীর মকামের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

তেরোতম আদব হলো তুমি তোমার পীরের গোপন রহস্য সম্পর্কে চুপ থাকবে। অলৌকিক ক্ষমতা, স্বপ্ন ও অন্যান্য আধ্যাত্মিক বিষয় যা তোমার পীর গোপন রেখেছেন, তা প্রকাশ করার জন্যে তুমি অনুমতি চাইবে না। কেননা, এগুলো গোপন রাখার মাঝে তোমার পীর কোনো ধর্মীয় কিংবা দুনিয়াবী কল্যাণ দেখতে পেয়েছেন যা সম্পর্কে তুমি অবগত নও। এগুলো প্রকাশ করলে ক্ষতি হতে পারে।

এ আদবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে মুরীদের সেই সব গোপন বিষয় যা পীরের জানা এবং যা পীরের কাছে গোপন রয়েছে। নিচের পংক্তিগুলো তাঁর হাল বর্ণনা করে:

’অনেক আন্তরিক ও মহৎ মানুষ আমার জানা,

যাদের গোপন বিষয় আমি অন্যদের থেকে করেছি আড়াল,

এসব যবে আমি রেখেছি আমা মাঝে লুকিয়ে,

প্রতিটি অন্তরেই রয়েছে মুক্ত একটি আঙ্গিনা,

যা এমনই রাজ্য যেখানে করা যায় ঘনিষ্ঠভাবে আলোচনা,

কাঙ্ক্ষিত নয় যার প্রকাশ ও প্রচারণা’।

চৌদ্দতম আদবের শর্ত এই যে, তুমি তোমার গোপন বিষয়গুলো তোমার পীরের কাছে প্রকাশ করবে। তা গোপন রাখার কোনো অনুমতি নেই। খোদা তা’লার তরফ থেকে তোমার প্রতি যে পুরস্কার বর্ষিত হয়েছে তার সবই পরিষ্কার ভাষায় ও সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা সহকারে পীরের কাছে ব্যক্ত করবে, যাতে করে তিনি এগুলো সম্পর্কে বিচার-বিবেচনা করতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ, তোমার সজ্ঞানে কোনো ব্যক্তিগত গোপন বিষয় তাঁর কাছে গোপন রাখা হলো; এটি হয়তো পরবর্তী পর্যায়ে অন্তরে জট সৃষ্টি করতে পারে যার দরুণ হয়তো তোমার শায়খের কাছ থেকে উপদেশ ও সাহায্যপ্রাপ্তিতে বিঘ্ন সৃষ্টি হতে পারে। তুমি এটা শায়খের খেদমতে পেশ করলে জট অপসারিত হবে।

পনেরোতম আদব দাবি করে যে তোমার পীর (কিংবা তাঁর কাছ থেকে তোমার কাছে আগত কিছু) সম্পর্কে অন্য কাউকে কিছু বলতে হলে তার উপলব্ধি ক্ষমতার সাথে বিষয়টি সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে। এমন কোনো অস্পষ্ট কিংবা সূক্ষ্ম বিষয় তাকে বলো না যা সে বুঝতে অক্ষম। এটা তার জন্যে অর্থহীন, এমন কি ক্ষতিকরও হতে পারে। ওই ব্যক্তি হয়তো তোমার পীরের প্রতি বদ ধারণাও পোষণ করতে পারে।

মুরীদ এসব আদব পালন করলে খোদায়ী করুণার নূর (জ্যোতি/আলো) এবং তাঁর অফুরন্ত নেয়ামত (আশীর্বাদ) তোমার প্রতি অবতীর্ণ হবে; যার প্রতি তোমার লক্ষ্য ছিল তা তোমার যাহেরী (প্রকাশ্য) ও বাতেনী (অপ্রকাশ্য) সত্তায় প্রকাশ পাবে এবং তুমি খাস্ (বিশেষ) দলে নিজ স্থান করে নেবে। লক্ষ্য করো যে, ওপরে উদ্ধৃত ১৫টি আদব কেবলমাত্র যথাযথ আচরণ উপলব্ধি করার জন্যেই, যাতে করে শিক্ষা দান ও তা গ্রহণ সংঘটিত হতে পারে। স্থান-কাল-পাত্রভেদে প্রতিটি সূফী তরীকা ও পীর মাশায়েখবৃন্দ এ সব আদবের সংস্কার সাধন করতে পারেন।

[মাহমুদ কাশানীর রচিত ‘মিসবাহ্ আল হেদায়া ওয়া মিফতাহ্ আল কেফায়া’ – “সঠিক পথের চেরাগ ও পর্যাপ্ত জ্ঞানের চাবিকাঠি” শীর্ষক পুস্তকের ১৫টি আদব অনুবাদ এখানে সমাপ্ত হলো)

পীর ও মুর্শিদ

পীর ও মুর্শিদের প্রতি মুরীদের আদবসমূহ: একজন মুরীদ কিভাবে পীর ও মুর্শিদের প্রতি মুহাব্বত সহকারে আদব বজায় রেখে ইসলামী জীবন পরিচালনা করবে তা নিন্মে প্রদত্ত করা হলো:
(১) আল্লামা মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমী (রা:) বলেন, যার আদবের অভাব এবং আনানিয়াতের স্বভাব রয়েছে সে কখনো মূল উদ্দেশ্যে পৌছতে পারবে না। তরিকতে আদবের ভূমিকা অপরিসীম। আদবেই আউলিয়া হওয়া যায়। আল্লামা জালাল উদ্দিন রুমী (রা:) আরো বলেন, বে-আদব মাহরুম গাশত আজ ফজলে রব অর্থাৎ যার আদব নেই সে আল্লাহর সকল প্রকার অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত। (মসনবী শরীফ)
তাহলে যে যত বড় ইবাদতকারী হোক না কেন যদি আদব বিদ্যমান না থাকে তবে সে আল্লাহর সকল প্রকার দয়া, অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত থাকবে। সুতরাং বুঝা গেল ইবাদতের চেয়ে আদবের ক্ষমতা অনেকগুণ বেশি।

(২) মুজাদ্দিদ-ই আলফে সানী (রা:) স্বীয় মাকতুবাত শরীফে আদবের ব্যাপারে বলেন, মুরিদ সমস্ত দিক হতে তার মন ফিরিয়ে স্বীয় মুর্শিদের প্রতি মনস্থাপনা করা আবশ্যক।
(৩) এরূপ স্থানে দাঁড়াবে যেন স্বীয় শরীরের ছায়া পীরের ছায়ার উপর না পরে।
(৪) কখনো পীরের নামাজের মসলা (বিছানার) উপর পা রাখবে না।
(৫) তার পাত্রে কোন সময় অজু করবে না।
(৬) তার ব্যবহৃত পাত্র ব্যবহার করবে না।
(৭) তার সামনে অন্য কারো সাথে কথা বার্তায় লিপ্ত হবে না।
(৮) অন্য কারো প্রতি লক্ষ্য করবে না।
(৯) পীরের অসাক্ষাতে তিনি যেখানেই আছেন ঐ দিকে পা লম্বা করে বসবে না। সে দিকে থুথু ফেলবে না।
(১০) পীর হতে যা প্রকাশ হয় তা প্রকাশ্যভাবে তা খারাপ বিবেচনা হলেও ভালো মনে করতে হবে। যেহেতু তিনি যাহা করেন ইলহামের দ্বারাই করেন।

(১১) পীরের সামনে তার বিনা অনুমতিতে নফল নামাজ ও জিকিরে লিপ্ত হবে না এবং তার সামনে তিনি ব্যতিত অন্য দিকে লক্ষ্য হবে না। সম্পূর্ণ পীরের দিকে মনোনিবেশ করে বসে থাকবে। এমনকি জিকিরেও রত হবে না। কিন্তু তিনি যে আদেশ দেন তই করবে। ফরজ ও সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ ব্যতিত কোন নামাজই তার সামনে আদায় করবে না।
(১২) পীরের ধ্যান করতে হবে। রাবেতায়ে শায়খ মানে হলো পীর সাহেব যখন মুরীদ থেকে দূরে থাকেন। তখন মুরীদ তাজিম ও মহব্বতে তার গুনাবলীকে সামনে রেখে পীরের ধ্যান করলে তার সোহবতে থাকার ন্যায় ফয়েজ ও বরকত লাভ করতে সক্ষম হয়। (কওলিল জামিল কৃত, শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দেস দেহলভী রা:)

(১৩) পীরের প্রতি যার মহব্বত যত হবে তার সফলতাও তত বেশি হবে। আল্লাহর নৈকট্য লাভ করার জন্য এই পন্থাই সর্বোত্তম। অযোগ্য মুরীদ যখন পীরের সঙ্গে সীমাতিরীক্ত মহব্বতে বিভোর হয়ে পীরের ধ্যানে মগ্ন হয়ে পরে, তখন কামেল মুর্শিদ খোদা প্রদত্ত ক্ষমতা বলে মুরীদের মধ্যে যোগ্যতা সৃষ্টি করে দিয়ে থাকেন। (কওলুল জামিল)
(১৪) বেশি বেশি তাসাউরে বিশ শায়খ করবে। তাসাউরে শায়খ মানে হলো পীরের ধ্যান।
(১৫) যত বেশি সম্ভব পীর মুর্শিদের সোহবত লাভের সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে কেননা, আল্লামা জালাল উদ্দিন রুমী (রা:) বলেন, তুমি যদি আল্লাহর ওলীগণের দরবার হতে দূরে থাক, তাহলে প্রকৃত অর্থে আল্লাহর দরবার হতে দূরে সরে গেলে। আল্লাহ তায়ালা পাক কুরআনে বলেন– اِنَّ رَحْمَةَ اللهِ قَرِيْبٌ مِّنَ الْمُحْسِنِيْنَ
অর্থ: নিশ্চয়ই আল্লাহর রহমত নেককারদের (ওলীদের) নিকটবর্তী।
(১৬) তাফসীরে কানজুল ঈমানে সূরা কাহাফের ৭০ নাম্বার আয়াতের টিকায় বলেন, মুর্শিদের প্রতি মুরীদ বা শিষ্যের আদব সমূহের মধ্যে একথাও অন্তর্ভূক্ত যে, সে মুর্শিদের কার্যাদির উপর অভিযোগের মুখ খুলবে না বরং একথার অপেক্ষায় থাকবে যে, তিনি সেটার হিকমত বা রহস্য প্রকাশ করবেন। (তাফসীরে মাদারিক ও আবুস সাউদ)

(১৭) আদবটি হলো, তুমি তোমার নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দ পরিহার করবে। পীর কী চান বা কী পছন্দ করেন তা না জেনে মুরীদের কোন কাজই করার অনুমতি নেই চাই সেই কাজ হোক ধর্মীয় বা বৈষয়িক, আম (সার্বিক) কিংবা খাস (সুনির্দিষ্ট)। তার অনুমতি ছাড়া তুমি পানাহার করবে না, সুন্দর সুন্দর জামা কাপড় পরবে না, উপহার দেবে না, ঘুমাবে না, কিছু নেবেও না, দেবেও না। তোমার শায়খের অনুমতি ও নির্দেশ ছাড়া কোন ধর্মীয় কাজেও জড়াবে না। এক রাতে রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা:) এর বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, এমতাবস্থায় তিনি হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা:)-কে রাতের নামাজে নিচু স্বরে কুরআন তেলাওয়াত করতে শুনতে পেলেন। অত:পর তিনি হযরত উমর ফারুক (রা:) এর বাসার পাশ দিয়ে যাবার সময় তাকে রাতের নামাযে উচ্চস্বরে কুরআন তেলাওয়াত করতে শুনলেন। সকালে যখন উভয়েই রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে হাজির হলেন, তিনি হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা:)-কে জিজ্ঞেস করলেন কেন তিনি নিচু স্বরে কুরআন তেলাওয়াত করেছিলেন?

হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা:) উত্তর দিলেন, আমি যার সাথে আলাপ করি তার কথা শুনি। হযরত ওমর ফারুক (রা:)-কে তার উচ্চস্বরে কুরআন তেলাওয়াতের কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি উত্তর দেন, আমি শয়তানকে তাড়িয়ে দেই এবং যারা ঘুমায় তাদেরও জাগিয়ে দেই। অত:পর রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের দু’জনকে উচ্চস্বর বা নিচু স্বর কোনোটিতেই তা করতে বারণ করলেন। বরং মধ্যম রাস্তা অনুসরণ করতে বলেন। এমতাবস্থায় কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ হলো এবং আপন নামায না খুব উচ্চস্বরে পড়ো না একেবারে ক্ষীণ স্বরে এবং এই দু’য়ের মধ্যবর্তী পথ সন্ধান করো। (সূরা বনী ইসরাঈল আয়াত ১১০)

সুতরাং এতে প্রমাণিত হয় যে, তোমার যদি আধ্যাত্মিক পীর তথা পথ প্রদর্শক থাকেন তবে তোমার উচিৎ হবে না নিজের উপলব্ধি অনুযায়ী চলা। এটা আধ্যাত্মিক জগতের প্রকৃত উপলব্ধির বেলায়ও প্রযোজ্য হবে।

(১৮) আপন মুর্শিদ ব্যতিত অন্য কারো প্রতি মনোযোগী হবে না। সাধ্যমত স্বীয় জান ও মালের দ্বারা মুর্শিদের খেদমত করবে।
(১৯) মুর্শিদের কোন কাজ বাহ্যিক দৃষ্টিতে ভুল বলে মনে হলেও তার কার্যকে সঠিক বলে মানতে হবে। কারণ তিনি তা বিশেষ কারণে আল্লাহর নির্দেশেই করে থাকেন।
(২০) মুর্শিদের কোন বিষয়ের প্রতি কোন প্রকার আপত্তি করবে না। এতে খোদার অনুগ্রহ হতে বঞ্চিত হবে ও মুরীদের প্রাপ্ত ফয়েজ বন্ধ হয়ে যায় এবং মুর্শিদের মনে যে আবরণ পতিত হয়। তাতে চিকিৎসাহীন বস্তুতে পরিণত হয়ে যায়।
(২১) ক্ষুদ্র ও বৃহৎ যাবতীয় বিষয়ে মুর্শিদের আদেশের অনুকরণ করবে।
(২২) তিনি যেভাবে ইবাদত করেন বা করতে বলেন, সেভাবেই করবে।
(২৩) তার কার্যকলাপ দেখে শরীয়তের মাসায়েল শিখবে।
(২৪) নিজ পীরের ছেলে-মেয়ে ও পরিবারদেরকে পীরের হাত হিসাবে পীরের তুল্যই সম্মান করতে হবে। তাদের যোগ্যতা কামালিয়াতের বিচার করবে না।
(২৫) কখনো পীরের দোষত্রুটি অনুসন্ধান করবে না, যেহেতু সৃষ্টির মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট ঐ ব্যক্তি যে অলীগণের ত্রুটি অন্বেষণ করে।

(২৬) পীরের অনুমতি ব্যতিত তার নিকট হতে অন্যত্র যাবে না।
(২৭) প্রয়োজন ব্যতিত পীরের নিকট হতে বিদায় নিবে না।
(২৮) কথা বলার সময় পীরের আওয়াজের উপর মুরীদের আওয়াজকে উচ্চ করবে না। কারণ এটা নিতান্তই বেয়াদবী।
(২৯) আপন মুর্শিদের নিকট কখনও কোন কারামত দেখার আগ্রহী হবে না। যেহেতু কোন মুমিন কখনও খোদা প্রাপ্তি ব্যতীত কারামত প্রত্যাশী হয়নি।
(৩০) নিজের কারামত বা অলৌকিক শক্তি থাকলেও আপন মুর্শিদের সামনে কখনো তা প্রকাশ করবে না।
(৩১) মোরাকাবার মধ্যে কোন বিষয় অবগত হলে এবং ব্যাখ্যার প্রয়োজন বোধ করলে স্বীয় পীরের ব্যাখ্যা ব্যতীত অন্য কোন ব্যাখ্যা গ্রহণ করবে না।
(৩২) মুর্শিদ কাশফ দ্বারা মুরীদের অবস্থা অবগত হচ্ছেন। এই আশায় বসে না থেকে বরং নিজের অবস্থা মুর্শিদকে জানাবে।
(৩৩) মুরীদ নিজেকে সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট ও হীন মনে করবে।
(৩৪) কোন ফয়েজ বা অনুগ্রহ লাভ হলে তা পীরের বিশেষ তাওয়াজ্জুহ মনে করবে। যদি অন্য কোন পীর স্বপ্নযোগে ফয়েজ দান করেন, তাহলে তা আপন মুর্শিদ হতেই মনে করবে। কারণ মুর্শিদ মুরীদের যোগ্যতা অনুযায়ী বিভিন্ন ছুরতে ফয়েজ প্রদান করে থাকেন।

(৩৫) ইমদাদুস সুলুক নামক গ্রন্থের ১০ পৃষ্ঠায় মওলভী রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী লিখেছেন। যথা: মুরীদের এও দৃড়ভাবে বিশ্বাস করতে হবে যে, পীরের রুহ এক জায়গায় আবদ্ধ নয়। মুরীদ দুরে বা নিকটে যেখানে হোক না হোক না কেন, এমনকি পীরের পবিত্র শরীর থেকে দুরে হলেও পীরের রুহানিয়াত কিন্তু দুরে নয়। যখন এই ধারণা বদ্ধমুল হয়ে গেল। তখন পীরকে সর্বক্ষণ স্মরণে রাখতে হবে, যাতে তার সাথে আন্তরিক সম্পর্ক প্রকট হয়ে উঠে এবং মুরীদ এর উপকারিতা লাভে ধন্য হয়ে উঠে এবং মুরীদ এর উপকারিতা লাভে ধন্য হতে থাকে। মুরীদ যে অবস্থার সম্মুখীন হয়, সে অবস্থার পীরের মুখাপেক্ষী থাকে। পীরকে আপন অন্তরে হাযির করে স্বীয় অবস্থায় মাধ্যমে পীরের নিকট লক্ষ্য বস্তুর প্রার্থী হতে হবে। আল্লাহর হুকুমে পীরের রুহ পার্থিব বিষয়টি মুরীদের অন্তরে অবশ্যই ইলকা করবেন। কিন্তু এর জন্য শর্ত হচ্ছে পীরের সাথে পূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা। পীরের সহিত সম্পর্কের কারণেই অন্তরে বাক্যময় হয়ে উঠে, আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের পথ উদঘাটিত হয়, আল্লাহ তাকে ইলহাম প্রাপ্তির যোগ্যতা সম্পন্ন করে দেন।

(৩৬) কামেল পীরকে পরশমণি তুল্য জানিতে হইবে। তাহাকে যথেষ্ট ভাবিয়া তাহার হস্তে পূর্ণরূপে আত্মসমর্পন করবে, তাহার সন্তুষ্টি অসন্তুষ্টির মধ্যেই স্বীয় মঙ্গল অমঙ্গল জানিবে। নিজের যাবতীয় আকাঙ্খা তাহার ইচ্ছার অনুগত করিবে, যেন পীরের ইচ্ছার বিপরীত মুরীদের কোন স্পৃহা না থাকে। আদব সম্মান পালন করা আধ্যাত্মিক পথের অতি আবশ্যকীয় বস্তু অন্যথায় কোনই ফল ভাল হইবে না।
(৩৭) স্বীয় পীর ব্যতীত অন্য কোন পীরের প্রতি লক্ষ্য করিবে না।
(৩৮) পীর উপস্থিত থাকাকালীন তাহার অনুমতি ব্যতীত নফল ইবাদত ও জিকিরে লিপ্ত হইবে না।
(৩৯) পীরের সম্মুখে অন্য কাহারও প্রতি মনোযোগী হইবে না, পূর্ণরূপে পীরের দিকে লক্ষ্য রাখিবে এমনকি জিকির এর খেয়ালও করিবে না। কিন্তু তিনি আদেশ করিলে তখনই খেয়াল করিবে।
(৪০) ফরজ, ছুন্নত ব্যতীত তাহার সম্মুখে অন্য কোন প্রকার নামাজ আদায় করিবে না। যদি কোন অজিফা ইত্যাদি থাকে তবে তাহার নিকট হতে অন্যত্র সরিয়া যাইয়া পাঠ করিবে।
(৪১) পীরের কোন বস্তু বা অন্য কোন দ্রব্য তাহার তাবারুক হিসাবে প্রাপ্ত হইলে, তাহা অজু সহ ব্যবহার করা কর্তব্য এবং তাহার পরিধান করত জিকির মোরাকাবা করা আবশ্যক।

(৪২) হযরত মির্জা (রা:) তিনি তাহার পীরের টুপী তাবারুক প্রাপ্ত হইয়া ছিলেন। উক্ত টুপী তিনি রাত্রে ভিজাইয়া রাখিতেন এবং এতে তাহা মর্দন করত: তাহার মলীন পানি পান করিতেন। তিনি ফরমাইয়াছেন যে, ইহাতে যেরুপ বাতেন উন্নতি হইয়াছিল, তাহা তাহার অন্য কোন আমল দ্বারা সাধিত হয় নাই। (মোজাদ্দেদ আলফেসানী (রা:) মাকতুবাত শরীফের প্রথম খন্ড ২৯২)
(৪৩) পীরের কথা মনোযোগ সহকারে শুনা এবং তা আন্তরিকভাবে পালন করা। পীরের মজলিশে তাঁর কথা শুনার নিয়তে যাওয়া। নিজের কথা শুনানোর আগ্রহ নিয়ে না যাওয়া।
(৪৪) পীরকে কোন কথা জিজ্ঞেস করতে হলে আদব সুলভ ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করবে। আপত্তির ভঙ্গিতে কোন প্রশ্ন করবে না। কেননা পীরের কথায় আপত্তি ফায়েজের পরিপন্থী। যেমন, শায়খ শিহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দী আওয়ারিফুল মা’আরিফ গ্রন্থে বলেছেন, “যে ব্যক্তি পীরের জওয়াবের সম্মান করেনা সে পীরের বরকত হতে বিরত থাকবে। আর যে ব্যক্তি পীরের জওয়াবে না বলে দেয় সে কখনো সফলকাম হবে না।
(৪৫) পথ চলার সময় পীরের সামনে চলবে না। কারণ মুরব্বীর ইজ্জত সম্মান করার অর্থ, আল্লাহ ও রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সম্মান করা।
(৪৬) ইলমে তাসাউফ (ইলমে বাতিন) অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত মানুষ শিরকে খফি হতে বাঁচতে পারে না। শিরকে খফি হল রিয়া (লোক দেখানো ইবাদত)।
(৪৭) পীর কামেলের যথারীতি এক দিনের হুজরীর দ্বারা মুরীদের যে উপকার হয়, তা অসাক্ষাতে দশ বছরের মেহনত রিয়াযতেও তা হাছিল হয় না। আউলিয়ায়ে কেরামের এক মুহুর্ত ছোহবত রিয়াহীন একশত বৎসরের ইবাদত অপেক্ষা শ্রেয়।

(৪৮) পীরের সকল আদেশ এবং চাল চলনের পুরোপুরি তাবেদার হওয়া কর্তব্য। মুরীদের কাছে পীরের মোহব্বত এ পরিমাণ হওয়া উচিত যেন পীর রোগাক্রান্ত হলে মুরীদ নিজের মধ্যে রোগের অনুভূতি পায়।
(৪৯) এমন কোন কাজ করতে বলা উচিত নয় যা মুর্শিদকে আদেশ মূলক হয়।
(৫০) মুর্শিদ এর অনুমতি ব্যতিত কোন কথা বলা উচিত নয়।
(৫১) মুর্শিদের মুখে মুখে কথা বলা উচিত নয় এবং মুর্শিদের মুখের কথা কেড়ে নিজে বলতে শুরু করা আদবের চরম খেলাফ।
(৫২) নবীয়ে দু’জাহানের ছাহাবীগণ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যেভাবে ভালবাসতেন মুরিদগণ পীরে সেভাবে ভালবাসতে হবে।
(৫৩) মুর্শিদের উপস্থিতিকে সেভাবে মূল্যায়ন করতে হবে, যেভাবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপস্থিতিকে সাহাবাগণ মূল্যায়ন করতেন।
(৫৪) মাকতুবাতে ইমাম রাব্বানী কিতাবে লিখিত আছে, নিজের পীর হতে অন্য পীরকে ভালো মনে করলে নিজ পীরের ফয়েজ লাভ হবে না।
(৫৫) কোন ঘটনা উদ্ভব হলে তখনই তা পীরের নিকট আরজ করবে পীর উক্ত বিষয়ে যা ব্যাখ্যা করেন, তাই মেনে নিবে। মুরিদ নিজ কাশফ বা ইলহামের উপর কোনরূপ ভরসা করবে না।
(৫৬) মুরীদের ফয়েজ বরকত যা কিছু লাভ হয় তা পীরের উছিলায় লাভ হয়েছে বলে মনে করবে। মোট কথা, পীরের প্রতি আদবই হলো তরিকার নিয়ামত প্রপ্তির প্রধান উপায়।
(৫৭) মুরিদ যদি পীরের প্রতি আদবের দিকে খেয়াল না করে এবং পীরের কাছে ত্রুটি এবং অক্ষমতাও প্রকাশ না করে তবে সে পীরের নেয়ামত প্রাপ্তি থেকে বিরত থেকে যাবে। এরূপ নূরুল আলা নূর কিতাবে আছে।

জামেউল উছুল কিতাবে নিন্মের আদব সমূহ উল্লেখ করা আছে-
(৫৮) প্রকাশ্যে পীরের সাথে কথা বলা বা কাজের সমালোচনা করা বা তার বিপরীতভাব পোষন করা নিজের ধ্বংস এবং অকল্যাণ ডেকে আনা ছাড়া আর কিছু নয়।
(৫৯) নিজ পীরের সামনে কখনো অন্য পীরের প্রশংসা করবে না। কারণ মুরীদের দৃঢ় বিশ্বাস রাখতে হবে যে আমার পীর কিবলাই সর্বশ্রেষ্ঠ পীর।
(৬০) মুরীদ সর্বদা নিজের অন্তরকে পীরের দিকে আকৃষ্ট রাখবে।
(৬১) মুরীদ এমনভাবে হাটবে না যাতে মুর্শিদের ছায়ার উপর তার পা পড়ে।
(৬২) পীরে কামেল যে অজিফা বা জিকির দান করেন, তা ব্যতীত নিজের বা অন্যের শিক্ষা দেওয়া কোন অজিফা বা জিকির করতে পারবে না। (কেননা, ডাক্তার রোগ চিনে ঔষধ দিয়ে থাকেন)
(৬৩) মুরিদ নিজের বাতেনী অবস্থা ভালো মন্দ যাই হোক না কেন, পীরকে জানাবে। পীর সাহেব অবস্থা বুঝে প্রতিকার করবেন। কারণ পীর বাতেনী ডাক্তার, মুরিদের বাতেনী অবস্থার তিনি চিকিৎসা করে থাকেন।
(৬৪) পীরের প্রতি কোন বিষয়ে সন্দেহের উদ্রেগ হলে তা প্রশ্ন করে জেনে নিবে। তাতে সন্দেহ দূর না হলে নিজেরই ভুল ও অযোগ্য বলে মনে করতে হবে।
(৬৫) পীরের কোন কথা বা কাজের আমানত নষ্ট করবে না। সম্মানের লাঘব জনক সামান্য কোন কাজও করবে না বা কথাও বলবে না।
মুর্শিদ ও মুরিদের মধ্যে উপরোক্ত আদব সমূহ ব্যতিত রুহানী উন্নতি সাধনা হয়না।

প্রিয় পাঠকবৃন্দ! চিন্তা করুন, আল্লামা মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমী ও মুজাদ্দিদ-ই আলফে সানী (রা:) সহ ওলামায়ে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত একজন মুরিদ তার আপন মুর্শিদের সাথে কিভাবে আদব বজায় রাখবে তা সুন্দরভাবে তুলে ধরেন। এজন্যই বিংশ শতাব্দির অন্যতম মুর্শিদ আল্লামা ড. আহমদ পেয়ারা বাগদাদী (রা:) বলতেন, “আদবে আউলিয়া, বে-আদবে শয়তান”। উপরোক্ত কথাগুলো কেবল হক্বকানী পীর ও মুর্শিদের জন্য প্রযোজ্য হবে। কেননা, বাংলাদেশে এমন অনেক পীর রয়েছে যে, ইলমে শরীয়ত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবায়ে কেরাম, ইসলামী দার্শনিক ও আউলিয়া কেরামগণের জীবন আর্দশকে কোন তুয়াক্কা না করেই পীর সেজে সরলমনা মানুষকে শয়তানিজাল ফেলে ধোকা দিচ্ছে। তাই আসুন! আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত, সাধারণ মানুষসহ আমাদের দেশ থেকে ভন্ড পীরগুলোকে বয়কট করি এবং হক্বকানী পীর ও মুর্শিদের হাতে হাত রেখে বায়াত গ্রহণ করি